Ajker Patrika

ইসরায়েলগামী বিমানের ককপিটে কুড়াল নিয়ে হামলা, সেই সহকারী পাইলটের পরিচয় কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইসরায়েলগামী বিমানের ককপিটে কুড়াল নিয়ে হামলা, সেই সহকারী পাইলটের পরিচয় কী
ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স-৮ বিমান। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটের ককপিটে কুড়াল নিয়ে হামলার অভিযোগে আলোচনায় আসা সহকারী পাইলটের পরিচয় প্রকাশ্যে এসেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর নাম হামাম আল-হামামি। তিনি ওমানের নাগরিক। তবে তাঁর পরিচয় বা কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

গত বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড-১০৭৩ ফ্লাইটে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। এরপর আজ শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘটনাটিকে একটি ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি জানিয়েছেন, সহকারী পাইলট ককপিটে বিমানের জরুরি কুড়াল নিয়ে আরেক পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মছারের ওপর হামলা চালান এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ যুক্ত ছিলেন কি না, তা এখনো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

কে এই সহকারী পাইলট

বার্তা সংস্থা এপিকে ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন, হামাম আল-হামামি ওমানের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে একজন উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনীতিক এবং একজন পশ্চিমা কূটনীতিক রয়েছেন। পরিচয় প্রকাশের অনুমতি না থাকায় তাঁরা নাম প্রকাশ করেননি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের ওই কূটনীতিক জানিয়েছেন, হামামি একাই এই হামলা চালিয়েছেন কি না, নাকি কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হামামি ওমানের নাগরিক হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন সিরিয়ার নাগরিক। প্রথম জীবনে কয়েক বছর তিনি আমিরাতেই কাটিয়েছেন।

তাঁর আগের বিমান চলাচল-সংক্রান্ত কর্মজীবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তাঁর অতীত কোনো কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার অজ্ঞাতনামা একটি সূত্রের বরাত দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শের কারণে ওমানের কর্তৃপক্ষ এক সময় হামামিকে দেশটিতে উড়োজাহাজ চালানো থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। তবে তাঁর কথিত ওই মতাদর্শ কী ছিল বা ওমান অন্য কোনো দেশ কিংবা এয়ারলাইনকে এ বিষয়ে জানিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

সিএনএন আরও জানিয়েছে, একই ধরনের উদ্বেগের কারণে হামামিকে বিমান প্রশিক্ষণ থেকেও সরিয়ে অন্য দায়িত্বে দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, হামামি নামে একটি লিংকডইন প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি সাত বছর ওমান এয়ারে কাজ করেছেন এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখান থেকে চলে যান। এরপর ২০২৫ সালের জুনে রয়্যাল এয়ার মারকে যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখান থেকেও চলে যান।

ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটে কী ঘটেছিল

বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে ফ্লাইট এফজেড-১০৭৩ দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করে। ফ্লাইটটিতে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পর ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠে হঠাৎ নিচে নামতে শুরু করে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে বিমানটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়। এরপর আবার ওপরে ওঠে এবং পুনরায় নিচে নামতে থাকে।

এ সময় ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী পাইলট ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মছারকে আক্রমণ করেন।

হামলায় আহত মছার পরে হাসপাতালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঘটনার বর্ণনা দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানটি যখন নিচে নামছিল, তখন তিনি ককপিটের মেঝেতে পড়ে যান। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি ককপিটের দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নেন।

দরজা খোলার পর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে ঢুকে সহকারী পাইলটকে কাবু করেন। পরে বিমানটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় স্থির হয়। ওই সময় উড়োজাহাজটির ট্রান্সপন্ডারে ৭৫০০ কোড দেওয়া হয়। এটি বিমানে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা হাইজ্যাকের সংকেত।

বিমানে থাকা দুই অতিরিক্ত পাইলট তখন উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে তাঁরা বিমানটি উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করান। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে বিমানটি অবতরণ করে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই পাইলটকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরে চিকিৎসকদের ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাঁদের আবুধাবিতে নেওয়া হয়।

হামলার বিষয়ে কী বলছে আমিরাত

আজ শনিবার আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি জানান, তদন্তকারীরা মনে করছেন সহকারী পাইলট একটি ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ শুরু করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ককপিটে থাকা জরুরি কুড়াল দিয়ে ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।

উল্লেখ্য, বিমানটির ককপিটে থাকা ক্র্যাশ অ্যাক্স বা জরুরি কুড়াল সাধারণত দুর্ঘটনার সময় উড়োজাহাজের কোনো অংশ কেটে বের হওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার আল-শামসি তদন্তকারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ঘটনাটি কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত কি না এবং এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনা বা কারও নির্দেশ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে।

তবে হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল কিংবা হামামি একাই এই ঘটনা ঘটিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য জানায়নি আমিরাত।

আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই এখনো শেষ হয়নি—এই ঘটনা তার একটি নতুন সতর্কবার্তা।

তদন্তে এখন কী জানা যাচ্ছে

ঘটনার তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে আবুধাবি। হামলার পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে অন্য কারও সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল কি না বিষয়গুলো তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি উড়োজাহাজটির কারিগরি পরীক্ষা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রমাণও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আল-শামসি জানিয়েছেন, ঘটনার সব দিক, উদ্দেশ্য, কারিগরি পরীক্ষা ও ডিজিটাল প্রমাণ যাচাইয়ের কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

এদিকে ওই ঘটনার পর থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট চলাচল স্থগিত রয়েছে।

সব মিলিয়ে হামামি সম্পর্কে যেসব তথ্য সামনে এসেছে, তার একটি বড় অংশ এখনো সংবাদমাধ্যমের অজ্ঞাতনামা সূত্রের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শ, হামলার উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত