Ajker Patrika

আগামী বছর তাইওয়ান আক্রমণ করবে না চীন—মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আগামী বছর তাইওয়ান আক্রমণ করবে না চীন—মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, ২০২৮ সালের আগে তাইওয়ানে চীনের সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। যদিও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং দেশটির সামরিক বাহিনীকে ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানকে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দখল করার মতো প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে এই বিষয়ে এখন মূল্যায়ন পাল্টেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা এ তথ্য জানিয়েছেন।

দুই মার্কিন কর্মকর্তা, এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কারণে চীনের সামরিক প্রস্তুতিতে বিলম্ব এবং ২০২৮ সালের তাইওয়ান নির্বাচনের ফলাফল দেখার জন্য বেইজিংয়ের আগ্রহ।

চীনের কিছু কর্মকর্তা আশা করছেন, ২০২৮ সালের নির্বাচনে এমন এক সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে, যারা তাইওয়ানকে চীনের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি অনুকূল হবে। তবে তাইওয়ানের ২০২৮ সালের নির্বাচনে যদি ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) টানা চতুর্থ মেয়াদে জয়ী হয়—বিশেষ করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে যদি পুনর্নির্বাচিত হন—তাহলে ২০২৮ সাল থেকে চীন সামরিক শক্তি ব্যবহারের দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন বলেন, ‘যদি এমনটা ঘটে, তাহলে আমার মনে হয় ২০২৮ সাল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠবে।’

লাই চিং-তে দুই বছর আগে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তিনি এবং তাঁর ক্ষমতাসীন ডিপিপি তাইওয়ানের চীন থেকে পৃথক একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ের পক্ষে অবস্থান করেন। এই অবস্থান বেইজিংকে প্রায়ই ক্ষুব্ধ করে। চীন তাইওয়ানকে তার ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে। অন্যদিকে তাইওয়ান চীনের এই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল তাইওয়ানের জনগণের।

এই মূল্যায়নটি আগে প্রকাশ্যে আসেনি। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ বহু বছর ধরে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন ধারণা ছিল যে, সি চিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনে তাইওয়ান দখলের জন্য প্রস্তুত রাখতে চান। ২০২৭ সাল হচ্ছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ।

চীন কখনোই তাইওয়ানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা বাতিল করেনি। তবে ২০২৭ সালের মধ্যে সামরিকভাবে প্রস্তুত থাকার জন্য সি চিনপিং কোনো নির্দেশ দিয়েছেন, সেটি চীন প্রকাশ্যে কখনো নিশ্চিত করেনি।

এ সপ্তাহে দেওয়া এক বক্তব্যে সি চিনপিং তাইওয়ানের প্রসঙ্গ তোলেন এবং ‘পুনরেকত্রীকরণ’ অর্জনে দুই তীরের সম্পর্কের শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের লক্ষ্যটি মূলত চীনের সামরিক সক্ষমতা অর্জনের সময়সীমা, তাইওয়ানে হামলা চালানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়। তারপরও বহু বছর ধরে ২০২৭ সালের এই সময়সীমা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রশাসনের মধ্যে তীব্র জরুরি মনোভাব তৈরি করেছে।

মার্কিন গোয়েন্দাদের ইঙ্গিত

চীনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ব্যাপারে অনীহার ইঙ্গিত আগেও দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়। মার্চে প্রকাশিত তাদের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, অন্তত সেই সময় পর্যন্ত চীনের আগামী বছর তাইওয়ানে হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ওই মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছিল, সম্ভব হলে চীন এখনো সামরিক শক্তি ব্যবহার না করে তাইওয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বেশি আগ্রহী।

আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমর্থক এবং অস্ত্র সরবরাহকারী। চীন ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে সামরিক পদক্ষেপের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখবে, এ বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন, বেইজিং হয়তো মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলও মূল্যায়ন করতে চাইতে পারে। বিশেষ করে বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব বাড়ছে কি না, সেটিও চীন বিবেচনায় নিতে পারে। তবে প্রথম মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে তাইওয়ান প্রশ্নে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলই মোটামুটি একই অবস্থানে রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০২৮ সালের মার্কিন নির্বাচনে চীনের কোনো পছন্দ থাকতে পারে। তবে তাঁর মতে, ‘আমার দৃষ্টিতে এটি ১৫ বছর আগে যতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত, এখন আর ততটা সিদ্ধান্ত নির্ধারণকারী বিষয় নয়।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বর্তমান মেয়াদে চীনের তাইওয়ান আক্রমণের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রবণতা কম দেখিয়েছেন। এমনকি গত বছর তিনি বলেছিলেন, সি চিনপিং তাঁকে জানিয়েছেন যে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় চীন তাইওয়ানে হামলা চালাবে না।

গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে সি চিনপিংকে আতিথ্য দেওয়ার পর তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্প খুব সীমিত মন্তব্য করেন। তিনি শুধু বলেন, তাঁদের দুজনের আলোচনায় তাইওয়ানের বিষয়টি উঠেছিল এবং সি তাঁর অবস্থান বুঝেছেন। চীন তাইওয়ান প্রশ্নকে তাঁর ‘একক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ এবং চীনের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে। চীন তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

মে মাসে বেইজিং সফরের পর থেকে ট্রাম্প প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন অস্ত্র প্যাকেজ তাইওয়ানের জন্য অনুমোদন করা থেকে বিরত রয়েছেন। তিনি এটিকে আলোচনায় ব্যবহারের জন্য একটি ‘দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল তাইওয়ানকে এমন সামরিক অস্ত্র ও সক্ষমতা দেওয়া, যাতে চীনা বাহিনী আক্রমণ করলে তাইওয়ান যথেষ্ট সময় ধরে প্রতিরোধ করতে পারে এবং সেই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ তার সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সি চিনপিং এখনো পিপলস লিবারেশন আর্মিকে আগামী বছরের মধ্যে প্রয়োজনে তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালানোর মতো সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গত বছর চীনের সামরিক বাহিনী তার পরিকল্পনা অনুযায়ী যতটা সামরিক অগ্রগতি করার কথা ছিল, ততটা করতে পারেনি। এর পেছনে চীনের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রভাব ছিল।

২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সি চিনপিং চীনের বিশাল আমলাতন্ত্রজুড়ে দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছেন। এই অভিযানে চীনের কোটি কোটি মানুষের বিশাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে লাখ লাখ কর্মকর্তাকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি, সরকার এবং সামরিক বাহিনীর বহু শীর্ষ কর্মকর্তাকে পদচ্যুত ও বহিষ্কার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিপলস লিবারেশন আর্মিও এই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়েছে। একাধিক তদন্ত ও বহিষ্কারের ফলে চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের আগে থাকা সাত সদস্যের মধ্যে এখন শি জিনপিংসহ মাত্র দুজন সক্রিয় কর্মকর্তা রয়েছেন। সি নিজেই এই কমিশনের চেয়ারম্যান।

স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত যুদ্ধ

মার্কিন ওই কর্মকর্তার মতে, গত বছর চীনের সামরিক মহড়াগুলো আগের কয়েক বছরের তুলনায় ছোট এবং তুলনামূলকভাবে কম হুমকিপূর্ণ ছিল। এ বছর মহড়ার মাত্রা কিছুটা আবার বেড়েছে। তবে ওই কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীনের সামরিক কর্মকর্তারা নিজেদের প্রস্তুতির বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট নন। ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে চীনের সামরিক বাহিনী একটি শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সেই শিক্ষা হলো, কোনো আক্রমণ শুরু হলে খুব দ্রুত তা শেষ করার চেষ্টা করতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে আটকে পড়া এড়িয়ে চলতে হবে। তবে চীনের সামনে এখনো অনেক কাজ বাকি। মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন সামরিক অভিযানগুলোর মধ্যে একটি, সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর নরম্যান্ডি অভিযানের পর কোনো সামরিক বাহিনী যে সবচেয়ে কঠিন অভিযান পরিচালনা করেছে, সেটিই হবে তাইওয়ানে আক্রমণ। আর সেই ধরনের অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অনেকগুলো উপাদান এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত