Ajker Patrika

ধ্বংসযজ্ঞেই নতুন শুরু গাজার শিশুদের, তিন বছর পর ফিরল শ্রেণিকক্ষে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ধ্বংসযজ্ঞেই নতুন শুরু গাজার শিশুদের, তিন বছর পর ফিরল শ্রেণিকক্ষে
গাজায় টিন, কাঠ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে, আবার কোথাও তাঁবু খাটিয়ে চলছে পড়াশোনা। ছবি: সংগৃহীত

চারদিকে ধ্বংসযজ্ঞ। কখন হামলা হয় কেউ জানে না। এমন করেই সকাল হয়, রাত নামে। যে বয়সটায় ব্যাগ কাঁধে স্কুলের দিকে ছুট দেওয়ার কথা, সে বয়সে এমন আতঙ্কেই জীবন কাটছে গাজার শিশুদের। তবুও নতুন স্বপ্ন দেখছে তারা। প্রায় তিন বছর পর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হলো গাজাতে। তবে আগের সেই স্কুল ভবনে নয়। নেই স্কুলের পোশাক, খাতা-কলমও। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনে কিংবা টিন, কাঠ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে, আবার কোথাও খোলা বালুর ওপর তাঁবু খাটিয়ে চলছে পড়াশোনা।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলছে, যুদ্ধের সময় গাজার ৯৮ শতাংশ স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী সশরীরে ক্লাস ও নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজার শিক্ষা কর্মকর্তারা।

প্রায় তিন বছর পর স্কুল খুললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। পূর্ব খান ইউনিসের শিক্ষা পরিচালক ইব্রাহিম রমাদান বলেন, এই সংঘাতে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী ও ৭৭০ জনের বেশি শিক্ষা খাতের কর্মী নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫৩২ জন শিক্ষক।

খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মোয়ায়েদ আবু মোস্তফার কাছে তাই স্কুলে ফেরা আনন্দের হলেও বাস্তবতা কঠিন। তিনি বলেন, ‘শেষবার আমি স্কুলে গিয়েছিলাম তিন বছর আগে। এখন আবার শুরু করছি। এটা আনন্দের।’

তবে যে স্কুলে মোয়ায়েদ ফিরেছে, সেখানে বসার জন্য চেয়ার নেই। তাঁবুতে বানানো এ স্কুলে মেঝেতে বসতে হবে। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও ভালো নয়। তার ভালো জুতা নেই, নেই খাতা-কলমও। যুদ্ধের সময় কয়েকজন বন্ধুকেও হারিয়েছে সে। তবু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় মোয়ায়েদ। তার ভাষ্য, ‘আমরা পড়ব, তাঁবুতে হলেও পড়ব।’

বাস্তুচ্যুত ১৫ বছর বয়সী সামার আবু সালমিও ফিরেছে শ্রেণিকক্ষে। পরিবারের সঙ্গে একটি তাঁবুতে বসবাস করছে সে। যুদ্ধের সময় ফোনে পড়াশোনা করেছে সামার। কিন্তু শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি দীর্ঘদিন।

স্কুলের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সামার বলে, ‘আমরা ফোনে পড়াশোনা করেছি এবং আমাদের শিক্ষকদের দেখিনি...এখন আমরা আবার আমাদের স্বপ্নের পেছনে ছুটছি...এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে।’

তবে স্কুলে ফিরলেও পড়াশোনার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করা তার পরিবারের জন্য কঠিন। সামার মনে করে, যুদ্ধের আগে জীবন অনেক সহজ ছিল। সে বলে, ‘যুদ্ধের আগে আমাদের জন্য সবকিছুই পাওয়া যেত—খাতা, কলম, পণ্য, পোশাক, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, এমন সব জিনিস, যা আমরা কম দামে কিনতে পারতাম।’

গাজার ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের সহায়তায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েক ডজন অস্থায়ী স্কুল তৈরি করা হয়েছে। এসব স্কুলের কোনোটি তাঁবু দিয়ে, কোনোটি ত্রিপল, টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি। কিছু স্কুল বালুর ওপর। কোথাও শ্রেণিকক্ষে কয়েকটি গদি আর একটি ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া আর কিছু নেই। সেখানেই গাদাগাদি করে বসে শিক্ষার্থীরা।

১৪ বছর বয়সী ইয়ামেন আবু সামরা এমনই একটি স্কুলে ফিরেছে। যুদ্ধের আগে স্কুলে যাওয়ার আনন্দের কথা মনে করে সে বলে, ‘আগে আমরা স্কুলে যাওয়ার জন্য আনন্দ নিয়ে ঘুম থেকে উঠতাম। এখন স্কুলে আসার সময় আমরা গুলি, রকেট, হামলার ভয়ে থাকি।’

শিক্ষা কর্মকর্তাদের হিসাবে, এ বছর অন্তত ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অস্থায়ী বেসরকারি স্কুল, অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রে সশরীরে ক্লাস করবে বলে আশা করা হচ্ছে। যারা শ্রেণিকক্ষে যেতে পারবে না কিংবা যুদ্ধের সময় গাজা ছেড়ে গেছে, তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম চালু থাকবে।

তবে গাজার শিক্ষা কার্যক্রম এখনো যুদ্ধের বাস্তবতার মধ্যেই চলছে। গত বছরের যুদ্ধবিরতিতে বড় ধরনের লড়াই থামলেও সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়নি। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ওই বছরের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের হামলায় দক্ষিণ ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে।

যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে স্কুলের সরঞ্জামের বাজারেও। গাজার স্টেশনারি ব্যবসায়ী খালেদ আলিয়ান জানান, ইসরায়েলের বিধিনিষেধের কারণে পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে দাম।

ইসরায়েল বারবার অভিযোগ করে আসছে, হামাস সামরিক কাজে স্কুলগুলো ব্যবহার করে। তবে হামাস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে গাজায় পণ্য প্রবেশ ও বের হওয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলের সামরিক সংস্থা কোগাট স্কুলে হামলা এবং পণ্য সরবরাহের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই তাই গাজার শিশুরা আবার স্কুলে ফিরেছে। কারও স্কুল এখন একটি তাঁবু, কারও শ্রেণিকক্ষে বসার জায়গা একটি গদি। কারও হাতে নেই খাতা-কলম, কারও পায়ে নেই ভালো জুতা। তবু দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে ফিরে এসে তারা আবার পড়াশোনা শুরু করেছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত