Ajker Patrika

স্বল্পমেয়াদি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে নজর ইরানের, নেপথ্যে যেসব কারণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ১৬: ৩০
স্বল্পমেয়াদি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে নজর ইরানের, নেপথ্যে যেসব কারণ
হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে রয়ে গেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সীমিত অন্তর্বর্তী চুক্তির (ইন্টেরিম অ্যাগ্রিমেন্ট) পক্ষে জোর দিচ্ছে ইরান। মূলত ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ কমানো, অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং একই সঙ্গে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় ধরনের কোনো ছাড় না দেওয়ার লক্ষ্যেই এই অবস্থান নিয়েছে দেশটি। ইরানের নীতি নির্ধারক মহলের ঘনিষ্ঠ সূত্র ও বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এই কৌশলটি ইরানের দীর্ঘদিনের পরিচিত নীতিরই প্রতিফলন। অর্থাৎ চাপ সহ্য করা, এমন কোনো আপস এড়িয়ে চলা যা ভবিষ্যতে পরিবর্তন করা যাবে না এবং মৌলিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে আলোচনা সচল রাখা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ তিনটি সূত্র এমনটাই জানিয়েছে।

তবে এই উদ্যোগের পেছনে আরও তাৎক্ষণিক কিছু উদ্বেগও কাজ করছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, সীমিত চুক্তি তাদের সময় কিনে দিতে পারে, আর্থিক স্বস্তি এনে দিতে পারে এবং অবনতিশীল অর্থনীতির কারণে বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। অথচ সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে না।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা ধীরে ধীরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ইরানের পাল্টা হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

তিন মাস পেরিয়ে গেছে। এপ্রিলের শুরুতে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংঘাত এখন কার্যত অচলাবস্থায় আটকে গেছে। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ উভয় পক্ষের ওপরই চাপ বজায় রেখেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকিও পুরোপুরি দূর হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই একটি পূর্ণাঙ্গ সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা কমিয়ে এনেছে। এর পরিবর্তে তারা এমন একটি অস্থায়ী সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম) নিয়ে আলোচনা করছে, যা কার্যত একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হিসেবে কাজ করবে। এর লক্ষ্য হবে খোলামেলা সংঘাতে ফেরার পথ রুদ্ধ করা, তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মূল বিরোধগুলো পরে নিষ্পত্তির জন্য রেখে দেওয়া।

তেহরানের লক্ষ্য কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি করা

তেহরানের দৃষ্টিতে এ ধরনের ব্যবস্থা মূলত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপকে নগদ অর্থ, কিছুটা স্বস্তি এবং উত্তেজনা হ্রাসের সুযোগে রূপান্তর করার উপায়। একই সঙ্গে তারা সংবেদনশীল পারমাণবিক কর্মকাণ্ড সীমিত করতেও রাজি নয়।

ইরান চায়—লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাতের অবসান, তেল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত কয়েক বিলিয়ন ডলার আয়ের প্রবেশাধিকার, অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে ছাড়, যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব বজায় রাখা। পাশাপাশি সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণও তারা পিছিয়ে দিতে চায়।

প্রস্তাবিত কাঠামোটি মূলত অস্থায়ী শিথিলতা এবং ধাপে ধাপে জলপথ ব্যবহারের সুযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা কিংবা তেহরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকৃত উপাদানও রয়েছে, সেসব প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে যাবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, তেহরানের হিসাব-নিকাশ মূলত যুদ্ধক্ষেত্রের ঝুঁকির চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ এবং অনিশ্চয়তার দ্বারা বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘ইরানের নেতারা বুঝতে পারছেন, সময় সব সময় তাদের পক্ষে নাও থাকতে পারে। তাদের হিসাব হচ্ছে, সীমিত হলেও সংলাপ চালিয়ে যাওয়া ভালো। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢুকে পড়লে তা ধীরে ধীরে দেশের অভ্যন্তরে শাসনক্ষমতা এবং বিদেশে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।’

বিক্ষোভ ফেরার আশঙ্কা তেহরানের

এই আলোচনার সাফল্যের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপের মুখে রয়েছেন। একই সময়ে ইরানকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হলে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থী মহলের সমালোচনাও তাকে মোকাবিলা করতে হবে।

অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্বও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং সংঘাত দেশটিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার মানের তীব্র অবনতির জন্ম দিয়েছে। সূত্রগুলোর মতে, স্বল্পমেয়াদি আর্থিক প্রবাহ পাওয়ার বিষয়টি তাই একটি প্রাথমিক চুক্তির প্রতি তেহরানের আগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ। কারণ, এতে অর্থনীতি সচল রাখা, তাৎক্ষণিক চাপ কমানো এবং নতুন করে অস্থিরতা বা গণবিক্ষোভের ঝুঁকি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সৃষ্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হাজারো মানুষকে হত্যা করেছিল। বার্লিনভিত্তিক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের (এসডব্লিউপি) ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, একটি সমঝোতা স্মারক রাষ্ট্রব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগও মোকাবিলা করতে পারে।

তাঁর মতে, ‘সংঘাতের অবসান, অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস, ইরানের চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো এবং পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে একটি সমঝোতা স্মারক রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থার ধীরে ধীরে ক্ষয় রোধে সহায়ক হতে পারে।’

হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের প্রধান হাতিয়ার

হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। দেশটির ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এটি এখন আর শুধু দর–কষাকষির একটি উপাদান হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সম্পদ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। সূত্রগুলোর মতে, এমন কোনো ব্যবস্থা যদি করা যায় যাতে নৌপরিবহন পুনরায় স্বাভাবিক হয় কিন্তু একই সঙ্গে ইরানের এই প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে তেহরানের হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাব বহাল থাকবে। ফলে বাণিজ্যিক চলাচল পুনরায় শুরু হলেও স্থিতিশীলতা রাজনৈতিক আলোচনার ওপরই নির্ভরশীল থাকবে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি সীমিত চুক্তি কার্যত যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, কিন্তু এতে ইরানকে ওয়াশিংটনের দাবির কাছে নতি স্বীকার করতে হবে না। সূত্রটি আরও বলেছে, ‘যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প মূলত ইরানকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের উপহার দিয়েছেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত