Ajker Patrika

রোজা ও রোগ প্রতিরোধ

সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত থাকতে চিকিৎসকের পরামর্শ

ডা. কাকলী হালদার
সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত থাকতে চিকিৎসকের পরামর্শ

রমজান হলো আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস। তবে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন হওয়ার কারণে এই সময়ে আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কিংবা ইমিউন সিস্টেম কিছুটা ভিন্নভাবে কাজ করে। একজন চিকিৎসক ও অণুজীববিজ্ঞানী হিসেবে মনে করি, সঠিক বৈজ্ঞানিক সচেতনতা থাকলে রোজার মাধ্যমেও শরীর রোগমুক্ত, দূষণমুক্ত এবং সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব।

রোজায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে কেন

রোজায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে শরীরে পানির অভাব দেখা দিতে পারে। আমাদের মুখগহ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের শ্লেষ্মা কিংবা মিউকাস মেমব্রেন শুকিয়ে গেলে সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাসের প্রবেশ সহজ হয়। এ ছাড়া ইফতার ও সেহরিতে অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং পরিচ্ছন্নতার অভাব পেটের পীড়া বা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তবে পরিমিত নিয়ম মেনে চললে রোজাই হতে পারে আপনার শরীরের জন্য সেরা অ্যান্টিভাইরাস।

পানিবাহিত ও পেটের রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা

রোজায় সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় ডায়রিয়া, টাইফয়েড বা জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগে। এর প্রধান কারণ হলো রাস্তার পাশের খোলা শরবত বা অপরিচ্ছন্ন পানি দিয়ে তৈরি ইফতারি। তাই কিছু নিয়ম মেনে চললে এসব রোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

নিরাপদ পানি: ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ গ্লাস নিরাপদ পানি পান করুন। বিশুদ্ধ পানি কিংবা পানি ফোটানোর কোনো বিকল্প নেই।

রাস্তার খাবার বর্জন: খোলা জায়গায় রাখা বেগুনি, আলুর চপ কিংবা পেঁয়াজিসহ অন্যান্য খাবার এড়িয়ে চলুন। এগুলোতে ক্ষতিকর ইকোলাই বা সালমোনেল্লা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকার প্রবল আশঙ্কা থাকে।

ফল ধোয়া: ফলমূল খাওয়ার আগে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর খান।

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও অণুজীব নিয়ন্ত্রণ

অণুজীবগুলো আমাদের হাতের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে বেশি মাত্রায়। এগুলোর প্রবেশ ঠেকানোর জন্য যা করতে হবে—

হাত ধোয়ার অভ্যাস: রান্না করার আগে, খাওয়ার আগে এবং বাইরে থেকে আসার পর সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন। এটি কোভিড-১৯-সহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাস সংক্রমণ কমায়। এ ছাড়া অন্যান্য সংক্রমণ ঠেকাতেও এটি প্রাথমিকভাবে কাজ করে।

মুখের স্বাস্থ্য: রোজা থাকলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে মুখে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটে। সেহরির পর দাঁত ভালোভাবে ব্রাশ করুন, যাতে ক্ষতিকর অণুজীব দাঁত বা মাড়ির ক্ষতি করতে না পারে।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ডায়েট

রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সচল রাখতে অণুজীববিজ্ঞানের ভাষায় প্রোবায়োটিকস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের খাবার হজমশক্তি বাড়াতে, ডায়রিয়া কমাতে এবং অন্ত্রের ভারসাম্য ফেরাতে সাহায্য করে। আমাদের দেশে সবচেয়ে পরিচিত প্রোবায়োটিকস হলো টক দই ও পান্তাভাত।

টক দইয়ের জাদু: ইফতারে বা সেহরিতে টক দই রাখুন। এতে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্ষতিকর প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

ভিটামিন-সি-সমৃদ্ধ খাবার: এ ধরনের সব খাবার ইমিউন সেলগুলোকে সচল রাখে। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে আমলকী, পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, লেবু, কিউই, স্ট্রবেরি, আনারস, পেঁপে, জাম, বরই, বেলসহ বিভিন্ন টকজাতীয় ফল। এগুলো ছাড়াও শাকসবজির মধ্যে আছে লাল, হলুদ ও সবুজ বেল মরিচ, ব্রকলি, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, আলু, মিষ্টিআলু, পালংশাক, পুঁইশাক, লাউশাক, কাঁচা মরিচ, পুদিনা ও ধনেপাতা।

প্রচুর সবজি ও আঁশজাতীয় খাবার: কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে এবং শরীরের অম্ল-ক্ষার বা পিএইচের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রচুর শাকসবজি খেতে হবে।

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের বিজ্ঞান

রোজায় সেহরির কারণে ঘুমের সময়ের কিছুটা পরিবর্তন হয়। তবে মনে রাখতে হবে, অনিদ্রা বা কম ঘুম সরাসরি শরীরের সাইটোকাইনস নামক প্রোটিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এ ছাড়া দৈনিক ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুমের চেষ্টা করুন।

দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের জন্য সতর্কতা

ডায়াবেটিস, ক্যানসার কিংবা কিডনি রোগীসহ যাঁদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা আগে থেকে কম, তাঁদের জন্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা আরও জরুরি। তবে রোজা রাখা অবস্থায় যদি রক্তের গ্লুকোজ লেভেল ওঠানামা করে, তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো ওষুধ এবং সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন।

রমজান শুধু আধ্যাত্মিক উন্নতির সময় নয়, বরং এটি শরীরকে নবজীবন দেওয়ার একটি সুযোগ। অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র হলো—পরিশুদ্ধ খাবার, নিরাপদ পানি এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা। অতি মাত্রায় ভোজন এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস ত্যাগ করে পরিমিতিবোধ বজায় রাখলে সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত থেকে রমজানের পূর্ণ বরকত আমরা হাসিল করতে পারব।

আপনার সুস্বাস্থ্যই হোক এবারের রমজানের আনন্দ।

সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত