Ajker Patrika

পরীক্ষার চেয়ে উপসর্গে জোর

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
পরীক্ষার চেয়ে উপসর্গে জোর
হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশু কোলে স্বজন। গতকাল ঢাকা শিশু হাসপাতালে। ছবি: ওমর ফারুক

দেশে এবার সংক্রামক রোগ হাম সংক্রমণ শনাক্তের হার ৪২ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি নমুনা পরীক্ষা করলে প্রায় অর্ধেকেই রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তবে একটি মাত্র পরীক্ষাগার থাকা ও কিটের সংকটের কারণে পরীক্ষা কম হওয়ায় সংক্রমণের প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া কঠিন হচ্ছে।

এমন অবস্থায় প্রতিদিনই হামের রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলায় পরীক্ষার অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা রোগ এবং রোগী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকার কথা উল্লেখ করে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন।

হামের চলমান সংক্রমণ বছরের শুরু থেকেই অল্পবিস্তর করে দেখা দিয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রোগী শনাক্ত, সন্দেহজনক হামের রোগী, মৃত্যু এবং হাসপাতালে ভর্তির তথ্য দিচ্ছে গত ১৫ মার্চ থেকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিমাত্রায় সংক্রামক রোগ হাম শনাক্তে প্রয়োজনীয়- সংখ্যক পরীক্ষা হচ্ছে না। কিটের সংকটের কারণে প্রতিদিন সীমিতসংখ্যক নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফলে প্রকোপের সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু রাজধানীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ল্যাবরেটরিতেই হামের পরীক্ষা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১২০টির কিছু বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। একটি কিট দিয়ে সর্বোচ্চ ৯০টি নমুনা পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার জন্য নাকের ভেতরের শ্লেষ্মা বা গলায় থাকা লালা নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ গতকাল মঙ্গলবার আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছে, তারা গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত ১৬ হাজার ৫২৭টি নমুনা পেয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৭৬৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৭১৪টিতে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ৪২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এখনো ৭ হাজার ৭৫৮টি নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৭২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

আইপিএইচ কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ধারণা না থাকায় পর্যাপ্ত কিট সংরক্ষণ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মো. মোমিনুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পরীক্ষার সক্ষমতা আরও বেশি থাকলেও বড় বাধা কিটের ঘাটতি। দৈনিক পরীক্ষার সক্ষমতা ৭০০ থেকে ৮০০টি। তবে কিটের সংকটের কারণে বর্তমানে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।...

পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো গেলে শনাক্তের সংখ্যাও আরও বাড়বে।’

সর্বশেষ ৪ এপ্রিল পরীক্ষা করা ১৬০টি নমুনার মধ্যে ৮২টি পজিটিভ পাওয়া যায়। অর্থাৎ শনাক্তের হার ৫১ শতাংশের কিছু বেশি। মো. মোমিনুর রহমান এ বিষয়ে জানান, গত কয়েক দিন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও এখন শনাক্তের হার বাড়ছে।

আইপিএইচ পরিচালক জানান, হামের পরীক্ষার কিট বাজারে পাওয়া যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মাধ্যমে আমদানি করে সরবরাহ করা হয়। এই সরবরাহপ্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে পরীক্ষা বাড়ানো যাচ্ছে না।

বর্তমানে আইপিএইচ ল্যাবরেটরিতে মাত্র ১০-১২টি কিট রয়েছে। এ দিয়ে হাজারের কিছু বেশি নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। নতুন কিট চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাওয়ার কথা রয়েছে।

পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার অন্যান্য কারণ

মোমিনুর রহমান আরও জানান, উপজেলা ও জেলা—সব পর্যায় থেকেই তাঁদের কাছে নমুনা পাঠানো হয়। ডব্লিউএইচওর অনুমোদন ছাড়া দেশের অন্য কোনো ল্যাবে এই পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। কিটও অন্যভাবে সংগ্রহ করা যায় না।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে হামের পরীক্ষা জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরিতে কেন্দ্রীভূত। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত ও নীতিগত কারণ। হামের মতো সংক্রামক রোগের নিশ্চিতকরণ পরীক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড হিসেবে ‘গ্লোবাল মিজল্‌স অ্যান্ড রুবেলা ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক প্রটোকল’ অনুসরণ করা হয়। যাতে পরীক্ষার ফল নির্ভরযোগ্য, তুলনাযোগ্য এবং বৈশ্বিক নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। এই মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের নির্দিষ্ট জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবেই নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা করা হয়। এতে মান নিয়ন্ত্রণ, তথ্যের ধারাবাহিকতা ও একক রিপোর্টিং কাঠামো বজায় থাকে।

নীতিগত শর্তের কড়াকড়ির পাশাপাশি কিটের সীমিত সরবরাহ, মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, দক্ষতা যাচাই, বায়োসেফটি অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতির কারণে দেশের অন্যান্য ল্যাবে পরীক্ষা বিস্তৃত করা হয়নি। অন্যান্য ল্যাব নমুনা সংগ্রহ ও ঢাকায় পাঠানোর কাজ করলেও সেখানে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা হয় না।

দুটি জেলার চিত্র

যেসব জেলায় সংক্রমণ বেশি উত্তর-পশ্চিমের চাঁপাইনবাবগঞ্জ তার অন্যতম। এই জেলার সিভিল সার্জন এ কে এম শাহাব উদ্দীন আজকের পত্রিকাকে জানান, বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৬১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে ২০৩টি নমুনা ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবে পাঠানো হয়। তার মধ্যে ৪৩টিতে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে সাতটি শিশুর মৃত্যু হলেও তা হামেই কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন বলেন, ‘যেসব এলাকায় সংক্রমণ ইতিমধ্যে শনাক্ত হয়েছে, সেখানে নতুন করে সব নমুনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। বরং রোগীর ক্লিনিক্যাল উপসর্গ, সংক্রমণ এলাকা এবং দুই মাস পর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নমুনা নেওয়া হবে। এখন চিকিৎসা, বাসায় আলাদাভাবে রাখা, ভিটামিন-এ এবং টিকাদান কার্যক্রমকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

ফেনীর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম আজকের পত্রিকাকে জানান, রোগীর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিটি উপজেলা ও সদর হাসপাতালে আলাদা ‘আইসোলেশন কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছে। আক্রান্তদের জটিলতা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। স্থানীয় শিশু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সন্দেহজনক রোগীদের দ্রুত শনাক্ত ও নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান ফেনীর সিভিল সার্জন।

পরীক্ষার বদলে উপসর্গে জোর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এখন পরীক্ষার ভ্যালু কম। কোনো উপজেলায় একটির বেশি হামের ঘটনা শনাক্ত হলে ওই এলাকায় আর নতুন করে পরীক্ষা করা হবে না। চিকিৎসকেরা সন্দেহভাজন রোগীর উপসর্গ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

পরীক্ষা না হলে সংখ্যা জানা ছাড়া ভবিষ্যতে রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও পরবর্তী বছরের প্রস্তুতির নীতি কীভাবে তৈরি করা হবে—এমন প্রশ্নে হালিমুর রশিদ বলেন, ‘তখন সন্দেহজনক রোগীকেও হাম হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শনাক্তকরণ নয়, হামের ক্ষেত্রে রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনায়ও বড় ঘাটতি রয়েছে। দ্রুত শনাক্তের পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, আক্রান্তদের আলাদা রাখা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ জরুরি হলেও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। ফলে কোনো যথার্থ কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দাঁড়াচ্ছে না।

পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হামের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু টিকাদান কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তের জন্য পরীক্ষার সক্ষমতা ও বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের নজরদারি এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সমন্বিত কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু টিকা দিয়ে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’

সংক্রমণের হালনাগাদ তথ্য

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল হামবিষয়ক হালনাগাদকৃত তথ্যে জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও সন্দেহজনক হামে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের, সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ২৬৩ জনের। একই সময়ে ৪২ হাজার ৯৭৯ জন সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ২৯ হাজার ৮৩১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এবং ২৬ হাজার ৩৬৮ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। গত এক দিনে ১ হাজার ১৮৬ জন সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ২৫৯ জন। সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী হিসেবে ৫ হাজার ৭২৬ জন শনাক্ত হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত