Ajker Patrika

হামের প্রকোপ: হামের চিকিৎসায় চাপে পরিবার

  • এক হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কম।
  • নানা হাসপাতালে ঘুরে ঋণে ডুবছে পরিবার।
  • চিকিৎসাধীন সন্তানের পাশে থাকায় উপার্জনও বন্ধ।
  • ‘চিকিৎসার অর্থনৈতিক বোঝা কমাতে কার্যকর পরিকল্পনা নেই’।
  • দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৯% পকেট থেকে বহন করতে হয়।
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
হামের প্রকোপ: হামের চিকিৎসায় চাপে পরিবার
হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে দৌড়ঝাঁপ অভিভাবকদের। সন্তানের কষ্ট লাঘবে ছুটছেন চিকিৎসকের কাছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালে। ছবি: আজকের পত্রিকা

হামে আক্রান্ত এক বছরের ছেলেকে নিয়ে টানা প্রায় তিন মাস হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছেন পিরোজপুরের জাকির হোসেন (ছদ্মনাম)। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ছেলের বেশ জ্বর হলে তাকে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসা শেষে ১ মার্চ বাড়ি যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে ছাড়পত্রে শ্বাসতন্ত্রের রোগ ব্রঙ্কাইটিস ও রক্তস্বল্পতার কথা উল্লেখ ছিল। বাড়ি ফেরার দুই দিনের মাথায় শিশুটি আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেই থেকে সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে ভোগান্তি আর শেষ হচ্ছে না জাকির হোসেনের। রোজগারের পথ বন্ধ করে ছেলের চিকিৎসার পেছনে ছুটে তাঁর আর্থিক অবস্থা এখন সঙিন।

দেশের চলমান মারাত্মক হামের প্রকোপের মধ্যে কমবেশি জাকির হোসেনের মতো অবস্থা আরও হাজারো অভিভাবকের। সন্তানের দীর্ঘ চিকিৎসা তাঁদের অনেকের জন্যই আর্থিক চাপের সৃষ্টি করেছে। কারও কারও জন্য আর্থিক ব্যয়ের বিষয়টি বিপর্যয়ের পর্যায়ে। হামে আক্রান্ত শিশুকে একটি হাসপাতালে নিলেই সুস্থ হচ্ছে, এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। শিশুদের নিয়ে ছুটতে হচ্ছে একাধিক জায়গায়।

সার্বিক পরিস্থিতি বুঝতে জাকির হোসেনের অভিজ্ঞতার কথায় ফেরা যাক। ১ মার্চ পিরোজপুর সদর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শিশুসন্তানকে নিয়ে কয়েকটি হাসপাতালে ছুটেছেন তিনি। এ দফায় প্রথমে বরিশালে প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন এবং পরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে ছেলের নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। সাত দিন চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাড়ি পাঠানো হয়। বাড়িতে অবস্থার অবনতি হলে খুলনার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ছেলেকে ১৯ মার্চ আবার হামের নানান লক্ষণসহ পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন জাকির। একপর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুটিকে ঢাকায় আনা হয়। ৩ মে তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে ওই দিন রাতেই ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

জাকির হোসেন কয়েক দিন আগে এ প্রতিবেদককে জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ-পথ্য ও যাতায়াত মিলিয়ে ছেলের চিকিৎসায় তাঁর এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এ জন্য তাঁর গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিকাজ দুটিই থেমে থাকে। তাই পরিবারের আয়ের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ। এর মধ্যে বৃষ্টিতে এক থেকে দেড় লাখ টাকার ধানের ক্ষতি হয়। ছেলের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাম-পরবর্তী জটিলতার কারণে তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন। জাকির হোসেনের পরিবারটি বুঝতে পারছে না, কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে।

সরকারি হিসাবেই, গত ১৫ মার্চ থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ৫৯ হাজার শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে অন্তত পৌনে ৩৭ হাজার শিশু। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে ৩৩ হাজার। আক্রান্ত শিশুদের সিংহভাগের পরিবারই চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের কারণে চাপের মুখে পড়েছে।

সরকারি হাসপাতালে খরচ তুলনামূলকভাবে কম হলেও বাস্তবে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর বড় অংশ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ জটিলতা দেখা দিলে একাধিক হাসপাতাল যেতে বা নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ/পিআইসিইউ) সেবা নিতে খরচ কয়েক গুণ বাড়ছে। এর সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স, যাতায়াত ও দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থানের খরচ পরিবারগুলোকে বিপদে ফেলছে। শিশুর পাশে থাকতে গিয়ে বাবা-মায়ের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেককেই ধারদেনা করে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।

গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ২১০ শিশু চিকিৎসাধীন।

হামে আক্রান্ত ১১ মাস বয়সী ছেলেসন্তানকে রাজধানীর ডিএনসিসির ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন ফরিদপুরের ভ্যানচালক আবির শেখ (ছদ্মনাম)। এর আগে সন্তানকে ফরিদপুরের একাধিক হাসপাতালে নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত শয্যার সংকট থাকায় ও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ঢাকায় আসতে হয়। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। এর বেশির ভাগই এসেছে ঋণ করে।

পাঁচ মাস বয়সী কন্যাশিশুকে নিয়ে যশোর থেকে ঢাকায় এসেছেন কেফায়েতুল্লাহ। তিনি জানান, একাধিক হাসপাতাল ঘুরে এবং পিআইসিইউ সংকটে শেষ পর্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আসতে হয়েছে তাঁকে। সেখানেও আইসিইউ শয্যা না পেয়ে বারান্দায় চিকিৎসা চলছে।

হামের চিকিৎসায় পরিবারগুলোর ঠিক কী রকম খরচ হচ্ছে—এ বিষয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থারই তথ্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিঙ্গার নেচারের বিএমসি সাময়িকীতে ২০২০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের শিশুদের হামের প্রকোপের অর্থনৈতিক বোঝা-বিষয়ক একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। এ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। গবেষণায় মূলত চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, হামে হাসপাতালে ভর্তির ঘটনায় গড় মোট ব্যয় ১৫৯ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই রোগীর পরিবার খরচ করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। হামে আক্রান্তরা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের বড় অংশ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। শিশুর নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে একাধিক হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। নিতে হচ্ছে আইসিইউ সেবা। এতে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। রোগের জটিলতা থাকলে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা খরচও হচ্ছে। আইসিইউ প্রয়োজন হলে কিংবা একাধিক হাসপাতালে ঘোরাঘুরির ক্ষেত্রে খরচ আরও বেশি হচ্ছে।

দেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হয়। সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচ হলেও পর্যাপ্ত সেবা ও শয্যার সংকটের কারণে পূর্ণাঙ্গ সেবায় ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয়ের (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যমতে, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করে। তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থার মতে, এই হার বাস্তবে আরও বেশি এবং বছর বছর তা বাড়ছে। অনেক পরিবার জটিল রোগের চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুন নাহিন শিমুল এ বিষয়ে বলেন, চিকিৎসা ব্যয় এবং পরিবারগুলোর আর্থিক ক্ষতির দিক উপেক্ষিত থাকছে। শিশু অসুস্থ হলে সাধারণত অভিভাবকদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থায় প্রান্তিক হাসপাতালগুলোতে রোগী ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা খরচ বাড়াচ্ছে।

ড. সাইফুন আরও বলেন, নিজস্ব ব্যয়ে চিকিৎসা গ্রহণ বড় অর্থনৈতিক বোঝা হলেও তা কমাতে কার্যকর পরিকল্পনা নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, রেফারেল ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।

পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, হামের ব্যাপক প্রকোপের জেরে পারিবারিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে মানুষ আর্থিক সংকটে পড়ছে।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দুটি কারণ উল্লেখ করে সাইফুন বলেন, অসুস্থ শিশুদের আতঙ্কিত স্বজনদের কীভাবে সামলাতে হবে, সে বিষয়ে অনেক স্বাস্থ্যকর্মীর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। শিশুর শ্বাসকষ্ট হলেই আইসিইউ দরকার হয় না। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে থাকা অক্সিজেন সুবিধা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভালো চিকিৎসা সম্ভব। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের ঘাটতির পাশাপাশি রোগীর স্বজনদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগের অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন এই বিশেষজ্ঞ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত