Ajker Patrika

মাঝবয়সী নারীদের মৃত্যু বেশি ডেঙ্গুতে

  • চলতি বছর এই রোগে মোট মৃত্যুর ৫৯ শতাংশই নারী।
  • আর আক্রান্তদের মধ্যে নারীর হার ৩৮ শতাংশ।
  • নারীদের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনায় আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
মাঝবয়সী নারীদের মৃত্যু বেশি ডেঙ্গুতে
ফাইল ছবি

চলতি বছরের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী এবং এতে মৃত্যুর সংখ্যা গত জুলাই থেকে বাড়তে শুরু করেছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যু বেশি হচ্ছে নারীদের। চলতি বছরে এই রোগে মোট মৃত্যুর ৫৯ শতাংশই নারী। অন্যদিকে আক্রান্তদের মধ্যে নারীর হার ৩৮ শতাংশ। এ প্রেক্ষাপটে হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া নারীদের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনার কাজ শুরু করেছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চলতি বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রজননক্ষম ও কর্মক্ষম বয়সের (২০ থেকে ৫০ বছর) নারীরাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। ২১ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যেই ডেঙ্গুজনিত মোট মৃত্যুর একটি বড় অংশ ঘটেছে।

চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৯২৯ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ৯০৮ জন বা ৬২ শতাংশ। নারী রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার

১৫ জন বা ৩৮ শতাংশ। তবে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে চিত্রটি উল্টো। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে নারী ৪৮ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫৯ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া পুরুষের হার ৪১ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ৩৭ জনের মধ্যে ২৬ জনই নারী এবং ১০ জন পুরুষ। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের বাইরের হাসপাতালগুলোতে মারা যাওয়া ৪৪ জনের মধ্যে ২২ জন পুরুষ ও ২২ জন নারী। এর কারণ হিসেবে শহরাঞ্চলে ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীদের হাসপাতালে ভর্তি ও জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব বা অবহেলার প্রবণতা গ্রাম বা মফস্বলের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীদের হাসপাতালে দেরিতে ভর্তি হওয়া, শারীরিক জটিলতা সময়মতো শনাক্ত না হওয়া এবং ঘরোয়া পরিবেশে মশার কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার পর অবহেলা তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত নারীরা হাসপাতালে আসে না। রক্তে অণুচক্রিকা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পর বা ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ দেখা দিলে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, নারীরা কেন বেশি মারা যাচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক কোনো ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি। এ জন্য অবশ্যই ময়নাতদন্ত করতে হবে। এর বিকল্প নেই। যাদের ময়নাতদন্ত করা যাবে না, তাদের ক্ষেত্রে মৌখিক ময়নাতদন্ত করতে হবে। অর্থাৎ রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে তার সর্বশেষ অবস্থা জানতে হবে এবং চিকিৎসার কাগজপত্র পর্যালোচনা করতে হবে।

চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে নারীরা পিছিয়ে আছে উল্লেখ করে আবু জামিল বলেন, নারীরা রোগী হওয়া থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে অবহেলার শিকার হয়। যেভাবে চিকিৎসা পাওয়ার কথা, সেভাবে পায় না। এতে যেমন পরিবারের অবহেলা রয়েছে, তেমনি তাদের নিজেদের অসচেতনতা ও অবহেলাও রয়েছে। ২০২৩ সালেও এমন পরিস্থিতি হওয়ার পর এখনো সরকারের কাছে তথ্য নেই, তারা কেন বেশি মারা গেল। এটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা ও অবহেলা। একই সঙ্গে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতনতা তৈরিতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নিতে পারেনি।

মৃত্যুর কারণ খুঁজছে আইইডিসিআর

চলতি বছর ডেঙ্গুতে পুরুষেরা বেশি আক্রান্ত হলেও নারীদের মৃত্যুহার কেন বেশি—এর পেছনে ভাইরাসের ধরন, চিকিৎসায় বিলম্ব নাকি অন্য কোনো কারণ কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখতে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান ও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা জোরদার করছে আইইডিসিআর।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, ‘ল্যাবরেটরি থেকে আমরা মূলত ডেঙ্গুর সেরোটাইপ বা ধরন এবং পজিটিভিটির হার নিয়ে কাজ করি। এ বছর ঢাকায় নমুনা পরীক্ষায় “ডেন-৩” সেরোটাইপ বেশি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে বান্দরবান থেকে সংগৃহীত নমুনায় “ডেন-২” বেশি মিলেছে।’ আগে আইইডিসিআরের নমুনা সংগ্রহ মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও এবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা বা ‘ডেথ রিভিউ’ করার বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ‘নারীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট করতে আমাদের একটি বিস্তারিত ডেথ রিভিউ করতে হবে। এ বছর ডেঙ্গুতে যারা মারা গেছে, তাদের মৃত্যুর কারণ ও ধরন বিশ্লেষণ করতে আমরা গত সপ্তাহে ডেথ রিভিউ করার নির্দেশ পেয়েছি এবং টিম নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করেছি।’

ডা. জাকী জানান, বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে রোগীর চিকিৎসার নথি সংগ্রহ, স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। চিকিৎসায় কোথায় ঘাটতি বা বিলম্ব ছিল, রোগী কখন হাসপাতালে এসেছে এবং নির্ধারিত চিকিৎসাপদ্ধতি থেকে বিচ্যুতি ঘটেছিল কি না, তা ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করে মূল কারণ খোঁজা হবে।

তবে নারীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে আইইডিসিআরের এই পর্যালোচনার পাশাপাশি ময়নাতদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল।

ডেঙ্গু বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত কর্মকর্তা উপপরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. আশরাফুন নাহার। তিনি বলেন, ডেথ রিভিউ ছাড়া বলা যাবে না, কেন নারীদের মৃত্যু বেশি। দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডেথ রিভিউ কমিটি রয়েছে। রোগী কখন, কীভাবে ও কী অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিল এবং কী অবস্থায় মারা গেছে, তা পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি আইইডিসিআরও কাজ করছে। নারীরা কী জটিলতায় মারা গেছে, তা পর্যালোচনা ছাড়া বলার সুযোগ নেই।

ডেনভ-৩-এর আধিপত্য

এদিকে দেশে কয়েক বছর পর আবার ডেঙ্গুর ডেন-৩ সেরোটাইপের আধিপত্য দেখা দিয়েছে বলে আইইডিসিআরের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। এর আগে টানা চার বছর ডেঙ্গুর প্রধান ধরন ছিল ডেনভ-২। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৭১টি নমুনা বিশ্লেষণে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশেই ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে। ৮ দশমিক ৫ শতাংশে মিলেছে ডেনভ-২।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের মোট চারটি সেরোটাইপ রয়েছে—ডেন-১, ২, ৩ ও ৪। কোনো ব্যক্তি একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে কেবল সেটির বিরুদ্ধেই শরীরে স্থায়ী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। ফলে যাদের শরীরে আগে ডেন-২-এর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল, তারা নতুন করে ডেন-৩-এ আক্রান্ত হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে রোগের জটিলতা ও ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে জ্বর বা উপসর্গ দেখা দিলেই অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত