Ajker Patrika

মেনোপজ ককটেল: অ্যালার্জি ও অ্যাসিডিটির ওষুধে কি মিলবে মুক্তি

ডা. ফরিদা ইয়াসমিন সুমি 
মেনোপজ ককটেল: অ্যালার্জি ও অ্যাসিডিটির ওষুধে কি মিলবে মুক্তি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে টিকটকে বিভিন্ন বিষয় মাঝেমধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। তেমনই স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি নতুন ট্রেন্ড ভাইরাল হয়েছে। একে বলা হচ্ছে মেনোপজ ককটেল। তবে দাবি করা হয়, অ্যালার্জির ওষুধ এবং অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ একসঙ্গে খেলে মেনোপজ বা রজঃনিবৃত্তির লক্ষণগুলো থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের দাবি, মিশ্রণটি হট ফ্ল্যাশ বা শরীরে হঠাৎ উত্তাপ অনুভব করা, স্মৃতিভ্রংশ কিংবা ব্রেন ফগ, উদ্বেগ, ক্লান্তি এমনকি প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিজঅর্ডারের উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর। এ বিষয়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এই বিপজ্জনক সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড নিয়ে চরম সতর্কতা জারি করেছেন। তাঁদের মতে, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া এভাবে দীর্ঘদিন ওষুধ খেলে শরীর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে।

মেনোপজ কোনো রোগ নয়। এটি নারীদের জীবনের একটি স্বাভাবিক হরমোনজনিত পরিবর্তন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভুল অথবা চটকদার ককটেল থেরাপিতে বিভ্রান্ত হবেন না। এ ক্ষেত্রে শরীরের পরিবর্তন বুঝতে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে সঠিক পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও মূল ঝুঁকি

মেনোপজের সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হিস্টামিনের মাত্রা কিছুটা প্রভাবিত হয়। তাই অ্যালার্জি ও অ্যাসিডিটির এসব ওষুধ সাময়িক আরাম দিচ্ছে বলে মনে হতে পারে। তবে ক্লের হেলথ ইনকরপোরেশনের পার্টনারশিপ ডিরেক্টর ডা. হ্যালি লারসন বলেন, এই ধারণার পেছনে কিছুটা বায়োলজিক্যাল যুক্তি থাকলেও মেনোপজে আক্রান্ত নারীদের ওপর এর কোনো নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণা চালানো হয়নি।

আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস এবং মেনোপজ সোসাইটির মতো বিশ্বসেরা স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো কখনো হট ফ্ল্যাশ বা মেনোপজের লক্ষণে অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহারের সুপারিশ করে না। কর্নেল ওয়েইল মেডিসিনের অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কেসিয়া গেইদার সতর্ক করেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করলে ঝিমুনি, ক্লান্তি, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব আটকে থাকা, হঠাৎ পড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। এসব ওষুধ খাওয়ার ফলে থাইরয়েড, অটোইমিউন বা হৃদ্‌রোগের মতো গুরুতর অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা ঢাকা পড়ার আশঙ্কা থাকে।

চিকিৎসা খাতের শূন্যতা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য

টিকটকের এই ভাইরাল ট্রেন্ড বুঝিয়ে দিয়েছে, নারীর স্বাস্থ্য অথবা মেনোপজ চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে এক বিরাট শূন্যতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পেয়ে নারীরা ইন্টারনেট দেখে নিজের মনমতো চিকিৎসা করার ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন। অথচ মেনোপজের উপসর্গ সামলাতে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য উপায় রয়েছে; যেমন—

১. হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি: হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা দূর করে দিতে পারে।

২. নন-হরমোনাল ওষুধ: এসএসআরআই, অক্সিবুটিনিন কিংবা ভেজাইনাল ইস্ট্রোজেন।

৩. প্রাকৃতিক উপাদান: ব্ল্যাক কোহোশ, রেড ক্লোভার বা সয়া আইসোফ্লেভনস ব্যবহার।

চিকিৎসকের পরামর্শ

লাইফস্টাইলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা ছাড়া আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে; যেমন—

১. মানসিক চাপমুক্ত জীবনযাপন।

২. নিয়মিত ব্যায়াম, বিশেষ করে ওয়েট বিয়ারিং এক্সারসাইজ, ইয়োগা।

৩. প্রিয় মানুষদের সঙ্গ।

৪. পছন্দের কাজে সময় কাটানো, যেমন ভ্রমণ, বই পড়া, গান শোনা, মুভি দেখা, বাগান করা ইত্যাদি।

৫. রাতে পর্যাপ্ত ঘুম।

৬. দুপুরে কিছুটা বিশ্রাম।

৭. চিকিৎসকের পরামর্শে মেনোপজে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান অথবা প্রয়োজনে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নেওয়া।

সূত্র: হেলথ লাইন, ওয়েব মেড

ডা. ফরিদা ইয়াসমিন সুমি, প্রসূতি, স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত