Ajker Patrika

কুকুরের লালা থেকে সেপসিস, চার হাত-পা হারালেন নারী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৩৯
কুকুরের লালা থেকে সেপসিস, চার হাত-পা হারালেন নারী
পোষা কুকুরের লালাই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাজ্যের ৫২ বছর বয়সী মনজিৎ সাংহাকে। ছবি: এনডিটিভি

একটি ছোট ক্ষত বা আঁচড়। যাঁদের পোষা প্রাণী আছে, তাঁদের জন্য এটা কোনো অতিসাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু এই নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়টিও কত ভয়াবহ পরিণতি দিতে পারে তাঁর উদাহরণ যুক্তরাজ্যের ৫২ বছর বয়সী মনজিৎ সাংহা। পোষা কুকুরের লালা বা আঁচড় থেকে সেপসিসে আক্রান্ত হয়ে চার হাত-পা খুইয়েছেন এই নারী। এমনকি দীর্ঘ ৩২ সপ্তাহ হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াইকালে কয়েক দফা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে একদিন কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর অসুস্থ বোধ করছিলেন মনজিৎ। পরদিন সকালে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর হাত-পা বরফশীতল হয়ে গিয়েছিল, ঠোঁট বেগুনি হয়ে উঠেছিল এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর স্বামী কমলজিৎ সাংহা বলছিলেন, ‘মাথায় তখন হাজার প্রশ্ন। ভাবছিলাম, ২৪ ঘণ্টারও কম সময়। এরই মধ্যে এমন কীভাবে হলো? শনিবার কুকুরের সঙ্গে খেলল, রোববার কাজে গেল, আর সোমবার রাতেই কোমায়।’

ওই অবস্থায় মনজিৎকে দ্রুত উলভারহ্যাম্পটনের নিউ ক্রস হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর ঠাঁই হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় চিকিৎসকেরা তাঁর দুই হাত এবং হাঁটুর নিচ থেকে দুই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। হাসপাতালে থাকাকালে মনজিৎ ছয়বার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন এবং তাঁর প্লীহাও অপসারণ করতে হয়।

মনজিতের শরীরের কোনো ছোট ক্ষত বা আঁচড়ের স্থানে কুকুরটি চেটে দেওয়ার ফলে এ সংক্রমণের সূত্রপাত হতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। এতে কুকুরের লালায় থাকা ব্যাকটেরিয়া সরাসরি রক্তে মিশে যায়। কুকুরের মুখে ক্যাপনোসাইটোফাগা ক্যানিমোরসাস (Capnocytophaga canimorsus) নামের একটি ব্যাকটেরিয়া যা কুকুরের জন্য ক্ষতিকর নয়, কিন্তু মানুষের রক্তে প্রবেশ করলে এটি গুরুতর সংক্রমণ, এমনকি সেপসিস বা মৃত্যুও ঘটাতে পারে।

কী এই সেপসিস

শরীরে কোনো সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া একটি জীবন সংকটাপন্ন অবস্থা হলো সেপসিস। এটি শরীরে এমন একটি বিক্রিয়া তৈরি করে যার ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে সুস্থ টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধ্বংস করতে শুরু করে। এর ফলে সারা শরীরে ব্যাপক প্রদাহ ছড়িয়ে পড়ে।

গুরুতর ক্ষেত্রে সেপসিস থেকে রোগী ‘সেপটিক শক’-এ চলে যেতে পারেন। এতে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায়, টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

যেসব কারণে হতে পারে সেপসিস

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, সেপসিসের প্রধান কারণ হলো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ। তবে ছত্রাক, পরজীবী বা ভাইরাসের কারণেও এটি হতে পারে। যেসব সংক্রমণ থেকে সাধারণত সেপসিস হয়—

১. ফুসফুসসহ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।

২. মূত্রনালির সংক্রমণ (যেমন কিডনি বা ব্লাডারের সমস্যা, বিশেষ করে ক্যাথেটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে)।

৩. পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ (যেমন অ্যাপেন্ডিসাইটিস, পেটের গহ্বরের সংক্রমণ বা পেরিটোনাইটিস, পিত্তথলি বা যকৃতের সংক্রমণ)।

৪. কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কের সংক্রমণ।

৫. ত্বকের সংক্রমণ।

যেসব লক্ষণে বুঝবেন সেপসিস হয়েছে

সেপসিসের কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো—

১. ত্বকে লালচে বা বিবর্ণ র‍্যাশ হওয়া।

২. শরীরে ছোট ছোট গাঢ় লাল ছোপ দেখা দেওয়া।

৩. প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা বারবার প্রস্রাবের তাগিদ।

৪. প্রচণ্ড অবসাদ ও দুর্বলতা।

৫. হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া।

৬. রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা।

৭. তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া।

সেপসিসের জটিলতা

সেপসিস থেকে প্রাণঘাতী বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

১. সেপটিক শক

সেপসিসের ফলে রক্তচাপ হঠাৎ করে বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। অক্সিজেনের অভাবে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দ্রুত একাধিক অঙ্গ বিকল হতে পারে।

২. অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম (ARDS)

সেপসিসের কারণে ফুসফুসে তরল জমে অক্সিজেন আদান-প্রদান মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং রোগীকে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘ সময় আইসিইউতে থাকতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।

৩. ডিসেমিনেটেড ইনট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশন (DIC)

এ অবস্থায় শরীরজুড়ে অস্বাভাবিক রক্ত জমাট বাঁধে, ফলে জমাট বাঁধার উপাদান দ্রুত শেষ হয়ে যায় এবং ব্যাপক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ক্ষুদ্র রক্তনালিতে জমাট বেঁধে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার উপাদান ঘাটতির কারণে রক্তপাতও বাড়ে।

৪. অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি

রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া, বিষাক্ত উপাদান ও প্রদাহের কারণে কিডনি বিকল হতে পারে। অক্সিজেনের অভাবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে। বেঁচে যাওয়া রোগীদের অনেকেরই দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতা থেকে যায়।

৫. পোস্ট-সেপসিস সিনড্রোম (PSS)

সেপসিস থেকে সেরে ওঠা বহু রোগী দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ এবং স্মৃতিভ্রমের মতো সমস্যায় ভোগেন। অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি, ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপের মতো উপসর্গ এবং বারবার সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের পরিচয়

যুদ্ধ এড়াতে পরমাণু ইস্যুতে ছাড়ে প্রস্তুত, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যা চাইছে ইরান

বিএনপির যে নেতাদের ৬ সিটিতে প্রশাসক করল সরকার

বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা নিয়ে যা বললেন মির্জা ফখরুল

ইরানে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন লারিজানি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত