Ajker Patrika

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন আবিষ্কার, টিকায় নির্মূল হবে টিউমার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩১ মে ২০২৬, ১১: ৫১
ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন আবিষ্কার, টিকায় নির্মূল হবে টিউমার
প্রতীকী ছবি

চিকিৎসকেরা এমন এক নতুন ক্যানসারবিরোধী ইনজেকশনের পরীক্ষা চালিয়েছেন, যা রোগীদের শরীরে থাকা সম্পূর্ণ টিউমার নির্মূল করে দিতে পারে। গবেষকেরা এই পরীক্ষার ফলাফলকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

বিশ্বের ১১টি দেশে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই ইনজেকশনটি দেওয়া হয় এমন রোগীদের, যাদের ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল বা আবার ফিরে এসেছিল এবং যাদের রোগ প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিল না। ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ (amivantamab) নামের এই ইনজেকশন এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগীর টিউমার ছোট করে ফেলেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। এমনকি ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে।

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, ‘যেসব রোগীর রোগ কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি উভয়ের প্রতিই প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে আমরা নজিরবিহীন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখেছি। এটি এমন একদল রোগীর গোষ্ঠী, যাদের জন্য চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই এই মাত্রার সুফল দেখা সত্যিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই চিকিৎসা প্রতিবছর হাজার হাজার রোগীর উপকারে আসতে পারে।’

গবেষণার ফলাফল আজ রোববার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হবে।

গবেষকেরা জানিয়েছে, এই ট্রায়ালে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়। মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার বিশ্বে ষষ্ঠ সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। অংশগ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়ে যায় বা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয় এবং ১৫ জনের টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়।

গবেষকেরা জানান, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেও এই ইনজেকশন একই ধরনের ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের তৈরি অ্যামিভান্টাম্যাব বর্তমানে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এর বেশির ভাগই ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে হলেও কলোরেক্টাল, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসার নিয়েও পরীক্ষা চলছে।

এই ‘স্মার্ট ইনজেকশন’ তিনটি উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি প্রথমত ইজিএফআর (এপিডারমাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর) নামের একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি জৈবিক প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়, যেটিকে ক্যানসার কোষ প্রায়ই চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। তৃতীয়ত, এটি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের ওপর আক্রমণ চালাতে সহায়তা করে।

এই চিকিৎসা থেকে উপকৃত হওয়া প্রথম দিকের রোগীদের একজন হলেন ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ। ২০২৪ সালের মে মাসে তাঁর জিবের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি ওরিগএএমআই-৪ ট্রায়ালে যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমাকে কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলো সফল হয়নি। এরপর আমাকে ওরিগএএমআই-৪ ট্রায়ালের জন্য সুপারিশ করা হয়। বর্তমানে আমি চিকিৎসার ১৭তম চক্রে আছি এবং এ পর্যন্ত অগ্রগতিতে আমি খুবই সন্তুষ্ট।’

অনেক ক্যানসার চিকিৎসার বিপরীতে অ্যামিভান্টাম্যাব শিরায় ড্রিপের মাধ্যমে নয়, বরং ত্বকের নিচে ছোট একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসা দ্রুততর ও রোগীদের জন্য আরও সুবিধাজনক হয়। পাশাপাশি বহির্বিভাগীয় ক্লিনিকে এটি দেওয়া অনেক সহজ। প্রতি তিন সপ্তাহে একবার দেওয়া এই চিকিৎসার বেশির ভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার। প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনেরও কম রোগীকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।

ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের বাসিন্দা ওয়ালশ বলেন, ‘এখন আমি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি। ট্রায়াল শুরু করার আগে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না। ফোলাভাব ও ব্যথার কারণে খেতেও খুব কষ্ট হতো। চিকিৎসা শুরু করার পর ফোলাভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং ব্যথাও অনেক কমেছে। কেমোথেরাপির সময় যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমার দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করেছিল, সেগুলোরও আর মুখোমুখি হতে হচ্ছে না।’

ওয়ালশ আরও বলেন, ‘অবস্থা যখন সবচেয়ে খারাপ ছিল, তখন আমি স্যুপ, রাইস পুডিং, টিনজাত রাভিওলি, স্প্যাগেটি এবং অসংখ্য অমলেট খেতাম। এর সঙ্গে প্রতিদিন চিকিৎসকের পরামর্শে তিন বোতল পুষ্টিকর দুগ্ধজাত পানীয় গ্রহণ করতাম। আমার ওজনও অনেক কমে গিয়েছিল। চিকিৎসার মাত্র দুটি চক্র শেষ হওয়ার পর থেকে আমার খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ছয় মাসের মধ্যে আমি আবার স্বাভাবিক খাবার খেতে পারি। সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিলাম প্রথমবার বড় একটি স্টেক খেয়ে। আমার কথা বলাও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কর্মক্ষেত্রে এখন আমি নিয়মিত হেডসেট ব্যবহার করে কথা বলি এবং কোনো সমস্যা হয় না।’

গবেষকেরা আরও উল্লেখ করেন, এই ট্রায়ালে এমন মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাদের ক্যানসার মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সম্পর্কিত পজিটিভ ওরোফ্যারিঞ্জিয়াল স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা ছিল না। বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এইচপিভি-জনিত নয়, এমন মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার সাধারণত চিকিৎসা করা বেশি কঠিন। ফলে এই রোগী-গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এমন অগ্রগতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

অ্যামিভান্টাম্যাব গ্রহণকারী রোগীরা চিকিৎসা শুরু করার পর গড়ে ১২ দশমিক ৫ মাস বেঁচে ছিলেন। অথচ তাঁরা এমন একধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন, যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পর রোগের ফলাফল সাধারণত খুবই খারাপ হয়।

আইসিআরের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, ‘এই গবেষণা দেখিয়েছে যে কঠোর ও সুপরিকল্পিত ক্যানসার গবেষণার মাধ্যমে নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন রোগীদের জন্য অর্থবহ অগ্রগতি এনে দিতে পারে, এমনকি যখন তাদের সামনে চিকিৎসার বিকল্প খুবই সীমিত থাকে। এত কঠিন চিকিৎসাযোগ্য রোগী-গোষ্ঠীর মধ্যে এই মাত্রার টিউমার প্রতিক্রিয়া এবং আশাব্যঞ্জক বেঁচে থাকার ফলাফল অর্জন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত