
গরম থেকে বাঁচতে মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফ্যানসহ নানা উপায় বেছে নিলেও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে সেটা মানা হয় না বেশির ভাগ ফার্মেসিতে। আর সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় ওষুধের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। সেই ওষুধ সেবন করে চিকিৎসায় সুফল পাচ্ছে না রোগীরা।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে সোয়া দুই লাখের বেশি ফার্মেসি রয়েছে। কিন্তু এর কতগুলোতে ওষুধ সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়, তার হিসাব নেই তাদের কাছে। তবে ওষুধ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থার মতে, বেশির ভাগ ফার্মেসিতেই সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা হয় না।
সম্প্রতি আজকের পত্রিকার সরেজমিনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, কলাবাগান, মহাখালীর পাশাপাশি ঢাকার বাইরে পিরোজপুর সদর হাসপাতাল সড়ক, ক্লাব রোড এবং কুমিল্লার কোটবাড়ি ও শহরের কান্দিরপাড় এলাকায় অন্তত ৫০টি ওষুধের দোকান পর্যবেক্ষণ করেছে আজকের পত্রিকা। এতে দেখা গেছে, ৫০টির মধ্যে ৪৬টিতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।
জানতে চাইলে পিরোজপুরের বাজার রোডে ফার্মেসি প্রিন্স মেডিকেল হলের কর্মচারী আলী হোসেন বলেন, ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকা ওষুধ সংরক্ষণের জন্য তাঁদের ফ্রিজ রয়েছে। তবে বাকি ওষুধগুলো শুধু সরাসরি রোদ থেকে দূরে রাখা হয়।
ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রার সামান্য হেরফেরেও ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়। দেশের বাজারের ৯০ শতাংশ ওষুধ ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঠান্ডা, শুকনো ও আলোহীন স্থানে সংরক্ষণের নিয়ম। অথচ অনেক ফার্মেসিতে কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই।
প্রসঙ্গত, আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার সকালে পাবনার ঈশ্বরদীতে ছিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা, ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৪ শতাংশ। আর গরমকালে তাপমাত্রা কোথাও কোথাও ৪০ ডিগ্রিও ছাড়ায়।
গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০২৪-২৫) বলা হয়, দেশে ২৫১টি অ্যালোপ্যাথিক, ২৫৪টি ইউনানী, ১৬৬টি আয়ুর্বেদিক, ৫৪টি হোমিওপ্যাথিক এবং ৪৪টি হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওষুধ উৎপাদন করে।
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের অনুমোদিত ও নিবন্ধিত ৩ হাজার ৫৯৯টি জেনেরিকের ৪১ হাজার ১৫৮টি ওষুধ রয়েছে; যেগুলোর অধিকাংশ সংরক্ষণ করতে হয় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। আর দেশে মোট নিবন্ধিত ফার্মেসি ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫২১টি। এগুলোর মধ্যে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৪০০টি মডেল ফার্মেসি এবং ৩২ হাজার মডেল মেডিসিন শপ ছিল।
গতকাল অধিদপ্তর জানিয়েছে, মডেল ফার্মেসির সংখ্যা হাজারের ঘরে আর মডেল মেডিসিন শপ প্রায় এক লাখ। এসবের মধ্যে মডেল ফার্মেসিগুলো নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে কার্যক্রম চালায়।
ওষুধের কার্যকারিতা রক্ষায় পরিবহন, বিপণন, মজুত ও সংরক্ষণের সব স্তরকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘গুড স্টোরেজ প্র্যাকটিস’ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কারখানা থেকে ফার্মেসি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই সমান গুরুত্ব দিয়ে ওষুধ সংরক্ষণ করতে হবে। ওষুধভেদে সংরক্ষণের তাপমাত্রা মূলত চার ধরনের—ঘরের তাপমাত্রা (২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস), শীতল অবস্থা (৮-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস), অতি শীতল অবস্থা (২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং হিমাঙ্কের নিচে (মাইনাস ৪ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। সাধারণ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের তাপমাত্রা (২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) সাময়িকভাবে ১৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত সহনীয় হলেও একটানা ৩০ ডিগ্রির ওপরে থাকলে ওষুধের উপাদান ভাঙতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত ওষুধের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ইউএস ফার্মাকোপিয়ার নির্দেশিকা মতে, ইনসুলিন বা ভ্যাকসিনের মতো প্রোটিনভিত্তিক ওষুধ ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাইরে গেলে স্থায়ীভাবে জমাট বেঁধে বা কার্যকারিতা হারিয়ে অকেজো হয়ে যায়।
চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কেনা যায় এমন ৩৯টি ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ (ওটিসি) ওষুধ রয়েছে ঔষধ প্রশাসনের তালিকায়। আলোহীন, ঠান্ডা এবং ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকায় দেশের তাপমাত্রা ওঠানামায় এসব ওষুধ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে জানিয়েছেন ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশে ড্রাগ লাইসেন্স এবং তা নবায়নের ক্ষেত্রে ৪টি শ্রেণিতে কিছু বাধ্যতামূলক শর্ত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মডেল ফার্মেসির ন্যূনতম ৩০০ বর্গফুট এবং মডেল মেডিসিন শপের অন্তত ১২০ বর্গফুট পাকা স্পেস থাকতে হবে। ধুলাবালি ও ময়লা রোধে ছাদ, মেঝে ও সিলিং পাকা হওয়া আবশ্যক। দোকানের ভেতরের তাপমাত্রা সব সময় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে (আদর্শ তাপমাত্রা ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখা বাধ্যতামূলক, যা নিশ্চিত করতে মডেল ফার্মেসিতে এসি থাকা আবশ্যক। এ ছাড়া ইনসুলিন বা ভ্যাকসিনের মতো কোল্ড চেইনের ওষুধের জন্য সচল ফ্রিজ থাকতে হবে। ওষুধ সরাসরি সূর্যালোক বা অতিরিক্ত আর্দ্রতায় রাখা যাবে না এবং মেঝে থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় কাঠ বা অ্যালুমিনিয়ামের তাকে (র্যাক) তা সংরক্ষণ করতে হবে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের শীর্ষ এক কর্মকর্তার দাবি, পরীক্ষাগারে কৃত্রিম উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় নির্দিষ্ট সময়ের পরীক্ষা শেষে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেই ওষুধ বাজারে ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। গরমে ওষুধ নষ্ট হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সাধারণত আসে না। তা ছাড়া প্রতি জেলায় কার্যালয় থাকার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ এবং ওষুধ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি চলছে।
এ বিষয়ে দেশের পাঁচ জেলার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বা ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক, সিভিল সার্জন, জেলা বা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আজকের পত্রিকা।
রাজশাহী জেলায় ৪ হাজার ১৪৩টি ফার্মেসি রয়েছে। রাজশাহীতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. কামরুল হাসান দাবি করেন, লাইসেন্স দেওয়ার সময় ওষুধ সংরক্ষণের শর্তগুলো লিখিতভাবে দেওয়া হয় এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ওষুধ প্রস্তুতের সময় পরীক্ষার মাধ্যমে এর স্থায়িত্ব কত দিন থাকবে, তা নির্ধারণ করা হয়। ওষুধের গায়ে লেখা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত গুণগত মান তখনই বজায় থাকবে, যখন নির্দেশিত তাপমাত্রা এবং অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করে তা সংরক্ষণ করা হবে।’
সাব্বির হায়দার বলেন, ‘তাপমাত্রায় মাঠপর্যায়ে ওষুধের ক্ষতির কোনো জাতীয় তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সময় গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ওষুধের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই সংকটের গভীরতা জানতে ঔষধ প্রশাসনের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বাধীন তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে গবেষণা চালানো উচিত।’
দেশে-বিদেশে দীর্ঘদিন ধরে ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠানের কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন ইউটিলিটি প্রফেশনালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাসমতুজ্জামান। তিনি বলেন, কারখানায় যেখানে নির্দেশিত তাপমাত্রা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক, সেখানে খুচরা ফার্মেসিতে তা কেন নিশ্চিত করা হবে না—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
ফার্মেসিগুলোতে সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ফার্মাকোলজির নিয়ম অনুযায়ী সিংহভাগ ওষুধ ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং কিছু সংবেদনশীল ওষুধ ২ থেকে ৮ ডিগ্রিতে সংরক্ষণ করতে হয়। দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব ফার্মেসিতে এসি নেই। খুচরা পর্যায়ে ওষুধ যাতে দ্রুত বিক্রি বা কনজিউম হয়ে যায়, আমরা সেদিকে নজর দিতে বলি।’ মডেল ফার্মেসিগুলোতে এসি রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেখানে একদমই নিয়ম মানা হচ্ছে না, সেখানে জরিমানা, মামলা করা হচ্ছে।’

দেশে গত এক দিনে হাম ও হামের উপসর্গে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে এবং বাকি তিনজনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
৬ ঘণ্টা আগে
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করেছে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন। আজ সোমবার বিকেল ৪টার দিকে হাসপাতালের ১ নম্বর গেটসংলগ্ন কার্ড কাউন্টারে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
৯ ঘণ্টা আগে
স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও রোগীকেন্দ্রিক সেবার উন্নয়নকে সামনে রেখে আজ আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘স্বাস্থ্যসেবার আজ ও আগামী’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা...
৯ ঘণ্টা আগে
দেশের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জনগণের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৭ দফা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে এ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন...
১১ ঘণ্টা আগে