Ajker Patrika

নির্মূল ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে হঠাৎ কেন হামের প্রকোপ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
নির্মূল ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে হঠাৎ কেন হামের প্রকোপ
ছবি: আজকের পত্রিকা

এক সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া হাম এখন দেশটির জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর সর্বশেষ তথ্য ও গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যথাযথ টিকাদানের হার হ্রাস পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের মাধ্যমে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি

২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হাম মুক্ত’ দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সিডিসি-এর সাম্প্রতিক ডেটা ও রিসার্চে দেখা যাচ্ছে সেই অর্জন এখন হুমকির মুখে।

২০২৪ এবং ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে হামে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। দেখা গেছে, স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে এমএমআর টিকার হার জাতীয়ভাবে ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। অনেক বাবা-মায়ের মধ্যে টিকার ব্যাপারে অনীহা বা ভুল ধারণা কাজ করায় এই হার কমছে।

এর মধ্যে ফ্লোরিডা, ওহাইও এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মতো জনবহুল অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় (পকেটস অব আনভ্যাকসিনেটেড পিপল) বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা গেছে।

সিডিসি-এর গবেষণায় যেসব প্রধান উদ্বেগ চিহ্নিত করা হয়েছে:

সিডিসি-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংকটের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:

১. বাইরে থেকে আসা সংক্রমণ: আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীরা যেসব দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রয়েছে সেখান থেকে সংক্রমণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছেন। টিকা না নেওয়া মার্কিন নাগরিকেরা বিদেশে গিয়েও সংক্রমিত হয়ে দেশে ফিরছেন।

২. টিকা না নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি: ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় কারণে শিশুদের স্কুলে টিকা না দেওয়ায় অনেক অঙ্গরাজ্যে বেড়েছে, যা গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (হার্ড ইমিউনিটি) কমিয়ে দিচ্ছে।

৩. তীব্র সংক্রামক ক্ষমতা: সিডিসি সতর্ক করেছে যে, হামের ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি এলাকা ত্যাগ করার দুই ঘণ্টা পর পর্যন্ত ভাইরাসটি বাতাসে সক্রিয় থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকদের উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় শিশু রোগ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশটি তার ‘হাম মুক্ত’ তকমা চিরতরে হারিয়ে ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে: যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে গুরুতর জটিলতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। সিডিসি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কয়েক মাসের জন্য ‘মুছে’ দেয়, ফলে আক্রান্ত শিশুর অন্যান্য সাধারণ সংক্রমণেও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।

সিডিসি-এর সুপারিশ

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিডিসি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য জরুরি কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে প্রতিটি শিশুকে ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি হারে এমএমআর টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন করতে হবে; আন্তর্জাতিক ভ্রমণে যাওয়ার অন্তত দুই সপ্তাহ আগে টিকার পূর্ণ ডোজ নিশ্চিত করতে হবে; যদি কোনো শিশুর জ্বর ও র‍্যাশ দেখা দেয়, তবে তাকে দ্রুত আইসোলেশনে রেখে স্বাস্থ্য বিভাগে খবর দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশে হামের এই পুনরুত্থান বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান থাকা সত্ত্বেও শুধু সচেতনতা এবং টিকাদানের অভাবে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ কীভাবে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি তারই বড় উদাহরণ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশেও মার্চ-এপ্রিল মাসে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই রোগের সংক্রমণ বেড়েছে।

গত ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি তথ্যমতে, সন্দেহভাজন হামের উপসর্গ নিয়ে ৪ হাজার ৬২৮টি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়ে ৯৮টি শিশু মারা গেছে। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্য বিভাগের ভিন্ন সূত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি (১৭৯ জন পর্যন্ত মৃত্যু) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় হামের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। মূলত ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস (প্রায় ৫ বছর) বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৮ বছর ধরে শিশুদের নিয়মিত হামের টিকা দেওয়ার কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া, কোভিড-১৯ এর সময় এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির কারণেও টিকা কাভারেজ কমে গেছে, যা এই ভয়াবহ সংক্রমণের মূল কারণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত