Ajker Patrika

লোভী মানুষের দল

সম্পাদকীয়
লোভী মানুষের দল

বিশাল রাজনৈতিক ঘটনাবলির আড়ালে পড়ে গেছে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে লেখা চমকপ্রদ প্রতিবেদনগুলো। সামনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ সব রাজনৈতিক দল অংশ নেবে কি না, সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়া-ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গগুলো। এই নির্বাচনী ডামাডোলে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনগুলো খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।

চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টরে একদল অর্থলোভী মানুষের অবাধ বিচরণ রয়েছে। তারা অর্থের বিনিময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেয়। দিনের পর দিন এদের দল বড় হয়েছে, প্রশ্নপত্রের জন্য বুভুক্ষু শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। এরই মধ্যে কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। মূলত চিকিৎসকেরাই এই অসততার সঙ্গে জড়িত, তবে ভর্তি-বাণিজ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ডাকসাইটে এক অতিরিক্ত সচিবের নামও শোনা যাচ্ছে, যিনি এখন স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগে কর্মরত।

পুলিশ তার কাজ করুক, ভর্তি-বাণিজ্যের রথী-মহারথীরা ধরা পড়ুক। সবাই চিনে রাখুক সমাজে প্রতিষ্ঠিত এই সব ধড়িবাজের চেহারা। কিন্তু শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের বিচার করা হলে ভর্তি-বাণিজ্যের সমস্যা কেটে যাবে ভাবা হলে তা ঠিক হবে না। প্রথমে খুঁজে নিতে হবে সমস্যার মূল।

ভাবতে হবে, কীভাবে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাকে ছেলেখেলা বানিয়ে নেওয়ার সাহস পেল একদল মানুষ? প্রথমত, নিজ যোগ্যতাকে কোচিং সেন্টারের কাছে জলাঞ্জলি দেওয়ার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে। কোচিং সেন্টার নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে বহু হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু নানা বেশে কোচিং সেন্টারের অস্তিত্ব বর্তমান এবং সেখানে শিক্ষার্থীরও অভাব নেই।

অর্থের বিনিময়ে যদি প্রশ্নপত্র পাওয়াই যায়, তাহলে কেন আর কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হবে—এই মানসিকতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাহলে এখানে দুটি লাভবান পক্ষের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। একটি হলো, যাঁরা টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করছেন পরীক্ষার্থীদের, অন্যটি হলো, যাঁরা টাকার বিনিময়ে এই প্রশ্নপত্র গ্রহণ করছেন এবং ফাঁস করা প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর মাঝে আরেকটি পক্ষ থাকে, যাঁরা এই শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া কি টাকার জোগান থাকবে?

এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়াটি কতটা নাজুক। চিকিৎসাশাস্ত্র এমন একটি পেশা, যার মধ্যে রয়েছে মহান ব্রত। মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে তোলার জন্য এই পেশার মানুষেরা জীবনপাত করে থাকেন। কিন্তু ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাহায্যে যাঁরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, তাঁদের নৈতিক অবস্থান কি সেই পর্যায়ে পৌঁছায়? মেধাবী যাঁরা পড়াশোনা করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হচ্ছেন, তাঁরাও তো তাঁদের কারণে বিব্রত হচ্ছেন।

সহজে সবকিছু লাভ করার যে মানসিকতা গড়ে উঠেছে, এ তারই ফল। লোভ আর দুর্নীতির মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে এই চিকিৎসক-অভিভাবক-শিক্ষার্থীর চক্র। উদ্ধার পেতে হলে গোড়াটা কাটতে হবে। বোঝাতে হবে মানবকল্যাণের এই পথে যেতে হলে সততা ও যোগ্যতাই মূল বিষয়। অন্য কিছু নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত