Ajker Patrika

ইরান হামলার ক্ষেত্রে সময় অনুকূলে—‘ইঙ্গিত’ দিচ্ছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে—ইরানে আরেক দফা হামলার ক্ষেত্রে সময় তাদের অনুকূলে রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে পরিস্থিতির উত্তেজনার পারদ কখনো বাড়িয়ে আবার কখনো কমিয়ে ‘এসক্যালেশন ল্যাডারে’ উত্তেজনার সিঁড়িতে অবস্থান করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অর্থাৎ, ধীরে ধীরে পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তোলার কৌশল নিয়েছেন এবং সঠিক সময়ে দেশটিতে হামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এসব তথ্য জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা। শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পাঠানো বিশ্লেষণধর্মী ব্রিফিংয়ের বিষয়ে অবগত ওই কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে না যে—ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ অদূর ভবিষ্যতে দমে যাবে।

ইরানের ধসে পড়া অর্থনীতির ওপর ক্ষোভ থেকে গত জানুয়ারিতে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে এটি ইসলামিক রিপাবলিকের সমর্থনের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত গ্রামীণ শহর এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরানের দমন-পীড়ন সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস রূপ নিচ্ছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলোচনার বিষয়ে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘সামনে শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠান, রমজান মাস, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের বার্ষিকী এবং নওরোজ (ইরানি নববর্ষ) রয়েছে।’ নওরোজ ২০ মার্চ এবং রমজান আগামী মাসে শুরু হতে যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবেই এসব ছুটির দিনে দেশটিতে উত্তেজনা তুঙ্গে থাকে।

থিংক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের প্রধান রান্ডা স্লিম বলেন, ‘এই উত্তেজনা প্রশমন সাময়িক বলে মনে হচ্ছে, আসলে সবাই ইরানে কী ঘটে তার অপেক্ষা করছে। আমার মনে হয় ট্রাম্প বাজি ধরছেন যে এই সরকার দীর্ঘকাল টিকতে পারবে না।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে অনিশ্চয়তা পছন্দ করেন, তা কারো অজানা নয়। যেমন, তিনি মাসের পর মাস ভেনিজুয়েলায় হামলার ইঙ্গিত দিয়ে নিকোলাস মাদুরো সরকারকে তটস্থ রেখেছিলেন। অবশেষে তিনি যখন পদক্ষেপ নিলেন, তখন মার্কিন স্পেশাল ফোর্স এক সাহসী রাত্রিকালীন অভিযানে ভেনিজুয়েলার নেতাকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ধরে নিয়ে যায়।

সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটাই হলো উইভ বা বুনন। ট্রাম্প কখনো উত্তাপ বাড়ান, আবার কখনো কমান। তাড়াহুড়োর কী আছে?’ ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বাস করে, এই বিক্ষোভ আর থামানো সম্ভব নয় এবং এটাই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উপযুক্ত সময়। তাই তারা এখন খতিয়ে দেখছেন, কোন ধরনের হামলা বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের ঘাঁটিগুলো।

ভেনিজুয়েলায় মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ট্রাম্প তাঁর সরকারের অবশিষ্টাংশকে দিয়েই দূর থেকে দেশ চালানোর পথ বেছে নিয়েছেন। ইরানেও যদি তিনি একই কৌশল প্রয়োগ করতে চান, তবে অপেক্ষা করার কারণ রয়েছে। সাবেক এক ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে চলতে দিলে বোঝা যাবে কারা টিকে থাকে এবং জনগণ কী চায়।

তিনি আরও জানান যে, ইরানে বর্তমানে বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পদ ও গোপন অপারেশন সক্রিয় রয়েছে যা বিক্ষোভকে প্রভাবিত করছে। এখনই সামরিক পদক্ষেপ নিলে সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে কোনো অপারেশনের কথা স্বীকার করেনি, তবে ইসরায়েলি চ্যানেল ১৪-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের বিদেশি শক্তি অস্ত্র সরবরাহ করছে। এমনকি বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যও নিহত হয়েছেন।

ইন্টারসেপ্টর এবং যুদ্ধজাহাজ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামলা বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কৌশলগত কারণও রয়েছে। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ এবং এর স্ট্রাইক গ্রুপ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে, যা পৌঁছাতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে।

এছাড়া ইরান ও ইসরায়েলের ওপর সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলার মোকাবিলা করার প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। গত জুনে আক্রান্ত হওয়ার পর ইরান ইসরায়েলের দিকে ৫ শতাধিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছিল। যদিও অধিকাংশ ভূপাতিত করা হয়েছে, তবে বেশ কিছু মিসাইল তেল আবিবের কেন্দ্রে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্যাক-৩, এসএম-৩ এবং থাড-এর মতো ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থার মজুদ কম রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বুধবার ট্রাম্পকে ইরানে হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছেন। এর আগে ইরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার জবাবে কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। যদিও আগে থেকে জানানোয় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সীমিত।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এবার যদি অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়, তবে ইরান আরও কঠোরভাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে অথবা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়।

সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্কের মতো উপসাগরীয় অংশীদারদের চাপের কারণেও ট্রাম্পের ভাষায় কিছুটা নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল ২০২৫ থেকে এই দেশগুলো তাদের ভূমি বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।

স্লিম বলেন, ট্রাম্প মূলত তাঁর উপসাগরীয় মিত্রদের শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন যারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এআই (AI) চিপ কিনছে এবং তার পারিবারিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে বেশ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দোহায় হামাস প্রতিনিধিদের ওপর ইসরায়েলি হামলার পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক ঠিক রাখতে কাতারকে একটি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যদিও ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তুরস্কের নিরাপত্তা গ্যারান্টি অনেক বেশি শক্তিশালী।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির ডেভিড শেঙ্কার বলেন, ট্রাম্প বর্তমানে তাঁর হামলার পরিকল্পনা এবং এই নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান দখল করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন ‘সাহায্য আসছে।’ কিন্তু বৃহস্পতিবার তিনি আবার বলেন, ‘আমরা অনেক জীবন বাঁচিয়েছি।’

শেঙ্কার মনে করেন, বর্তমানে যা কিছু করা হচ্ছে তা আসলে হামলার প্রস্তুতির অংশ। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে হামলা আসছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত