আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশকের শিক্ষার্থীরা একটি রচনার সঙ্গে খুব পরিচিত। আর তা হলো, ‘এইম ইন লাইফ’ বা ‘জীবনের লক্ষ্য’। প্রায় সব রচনার বইয়ে লেখা থাকত ‘আমার জীবনের লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া’ কিংবা ‘আমার জীবনের লক্ষ্য শিক্ষক হওয়া’। রচনার পাশাপাশি মুখস্থ করানো হতো আরও অনেক চিঠি আর দরখাস্ত। বাসার শিক্ষক হোক কিংবা বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বেশির ভাগ সময়ে যা আছে তা-ই মুখস্থ করে লিখতে বলতেন।
বইয়ে যা আছে তা পড়ে, পরীক্ষায় লিখে এলেই নাকি নম্বর বেশি পাওয়া যায়! অথচ নিজের জীবনের লক্ষ্য নিজে ভেবে স্থির করাটাই কিন্তু জরুরি। একটি রচনায় নিজের ইচ্ছেমতো লিখে মনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করার স্বাধীনতা ছিল না। এমনও সময় গেছে, বড়দের মুখে শুনেছি, রচনা লিখলে হাতের লেখা কেমন, কয় পৃষ্ঠা আর কয় প্যারা লেখা হলো, তা বিবেচনা করে নম্বর দেওয়া হতো।
এরপর যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তখন দেখা যায় হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া ডাক্তার বা শিক্ষক অন্যদের হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। সেই মুখস্থ পড়া পড়তে পড়তে অনেকেই নিজেদের জীবনের লক্ষ্য এই ডাক্তার আর শিক্ষকেই স্থির করে ফেলত।
পারিবারিক শিক্ষার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পাঠ নেওয়া শুরু হতেই শিশুদের জীবনে শিক্ষকদের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। সে ক্ষেত্রে চিন্তার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী তাদের জীবন ঘুরেফিরে লক্ষ্যহীন জাহাজের মতো চালাতে থাকে। পছন্দের বিষয়ে পড়তে না পারায়ও অনেক শিক্ষার্থী অকালেই ঝরে যায়। আত্মবিশ্বাস সবার মধ্যে এক রকম থাকে না। অনেককে সে জায়গাটা তৈরি করতে সাহায্য করতে হয়। আর পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষক এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন।
নিজ গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা করানো বা গরিব ছাত্রদের পড়ানো নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ। তাই বলে সবার জীবনের লক্ষ্য কিছু নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর আবর্তনের ফলে তাঁদের চিন্তা এবং ইচ্ছাশক্তি লোপ পায়। তারা ভাবে এগুলো না হতে পারলে তো পড়াশোনা করাটাই বৃথা। সত্যি কি তাই!
কেউ যদি পশু-পাখিপ্রেমী হয় আর ভবিষ্যতে খামার দিতে চায় তাতে ক্ষতি কী? কেউ কৃষক হতে চাইলে তাকে নিয়ে হাস্যকরভাবে রসিকতা কেন হবে? কেউ কেবলই চাকরি করতে চাইলে তাতে ক্ষতি কী? এমনকি কেউ যদি ভাবেন তিনি নিজ থেকে পরে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাতেই বা ক্ষতি কোথায়? আসলে লোকদেখানো আর কানকথা শুনেও অনেকে জীবনে তার নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে সরে যায়।
প্রতিটি জীবন সুন্দর, প্রতিটি ভালো লক্ষ্যই সমাজ ও দেশের পক্ষে কল্যাণকর। একটা ‘এইম ইন লাইফ’ রচনা কখনোই প্রতিটি স্বতন্ত্র ব্যক্তির জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে না।










