Ajker Patrika

দক্ষিণ কোরিয়ায় গরমে মাঠেই ‘সেদ্ধ’ হয়ে যাচ্ছে আলু-তরমুজ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ০৯
দক্ষিণ কোরিয়ায় গরমে মাঠেই ‘সেদ্ধ’ হয়ে যাচ্ছে আলু-তরমুজ
তীব্র গরমে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। ছবি: সংগৃহীত

তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠা নজিরবিহীন এক দাবদাহে ফুটছে পুরো পূর্ব এশিয়া। ঐতিহাসিক সব রেকর্ড ভেঙে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকংজুড়ে বিরাজ করছে প্রখর খরা ও চরম তাপমাত্রা। তাপমাত্রার এই তাণ্ডবে শত শত একর জমির ফসল পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে লাখ লাখ গবাদিপশু ও খামারের মাছ। গৃহপালিত পশুর পাশাপাশি হিট স্ট্রোকে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষও।

দক্ষিণ কোরিয়ার গ্যাংওয়ান প্রদেশের আলুচাষি লি সং-হিয়ক উত্তর-পূর্বের ইয়াংগু কাউন্টিতে তাঁর জমিতে নেমে দেখেন আলুগুলো পচে নরম হয়ে গেছে। বিচলিত কণ্ঠে স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগেও ফসল ভালো ছিল। এখন মাটি যেন ওভেনের মতো গরম হয়ে গেছে। একটি-দুটি খেত নয়, পুরো মাঠের আলুর একই অবস্থা। কতটা হতাশার, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

২ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়ানসানে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯০৪ সালে আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই দক্ষিণ কোরিয়ায় নথিভুক্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। দেশের ডিজিজ কন্ট্রোল এজেন্সির তথ্যমতে, এই দাবদাহের কারণে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া তীব্র গরমে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং ১৪ লাখের বেশি খামারের মাছ মারা গেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতায় কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে ঘরের বাইরের সমস্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়ে সর্বাত্মক দাবদাহের সতর্কতা জারি করেছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং মন্ত্রিপরিষদকে বলেছেন, ‘এমন চরম আবহাওয়া আমরা আগে কখনো দেখিনি। জলবায়ুর এই চরম রূপই যেহেতু নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে, তাই জাতীয় সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে।’

অন্যদিকে গুয়াংজু অঞ্চলের ৫০ বছরের অভিজ্ঞ তরমুজ চাষি হং কিয়ং-হি জানান, কয়েক দিনের গরমে তাঁর তরমুজগুলো গলে নরম মণ্ডে পরিণত হয়েছে। পাঁচ দশকের কৃষি জীবনে তিনি এমন পরিস্থিতি কখনো দেখেননি। দক্ষিণ জোল্লা প্রদেশের স্ট্রবেরি চাষি ইউন উ-হা তাঁর তিন মাসের পরিশ্রমে গড়ে তোলা চারা গাছ হারিয়েছেন, যা কৃষি বিমার আওতাভুক্ত না থাকায় তাঁকে চরম আর্থিক ঋণের মুখে পড়তে হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিবেশী দেশ জাপানেও একাধিক স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের আবহাওয়া সংস্থা এই বছর ৪০ ডিগ্রির ওপরের তাপমাত্রার জন্য প্রথমবারের মতো ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুর গরমের দিন’ নামে একটি নতুন ক্যাটাগরি চালু করতে বাধ্য হয়েছে। দেশটির রাজধানী টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় হিট স্ট্রোকে তিনটি সিংহ মারা গেছে।

জাপানের ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন সেন্টারের গবেষকেরা জানিয়েছেন, মানুষের সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া জুলাই মাসের এই তীব্র দাবদাহ হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল। তাদের হিসাব মতে, মানুষের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এমন দাবদাহ ১০ হাজার বছরে মাত্র একবার দেখা যেত।

একই সময়ে হংকংয়ে আবহাওয়া দপ্তরের তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৮৮৪ সালে তাপমাত্রা হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ। টাইফুন ডলফিনের প্রভাবে শহরের ওপর গরম বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে সেখানে উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য রাখা তাপ-সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

হংকং অবজারভেটরির সাবেক প্রধান লাম চিউ ইং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড গড়েও যদি সতর্কতার মাত্রা লাল চিহ্নে না পৌঁছায়, তবে এই ব্যবস্থা কি শুধুই শোপিস হিসেবে রাখা হয়েছে?’

সমালোচনার মুখে হংকংয়ের শ্রম বিভাগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকং ছাড়াও চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে জুলাই মাসে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে পরপর কয়েক দিন রাতের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি, যাকে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্যানেলের (আইপিসিসি) অন্যতম প্রধান লেখক জুনে-ই লি জানান, তিব্বতীয় মালভূমি ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর তৈরি উচ্চচাপের বলয় এবং এল নিনো প্রভাবের যৌথ কারণে এই দাবদাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এশিয়ার উষ্ণায়নের গতি তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ড. লি সতর্ক করে বলেন, আগামীতে এ ধরনের দাবদাহ এবং পর্যায়ক্রমিক অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও নিয়মিত ও তীব্র হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে অতি দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি সমন্বিত অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত