Ajker Patrika

বৈবাহিক ধর্ষণ: ভারতে আলোচনায় নতুন ওয়েব সিরিজ ‘চিরাইয়া’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১৫: ৪৪
বৈবাহিক ধর্ষণ: ভারতে আলোচনায় নতুন ওয়েব সিরিজ ‘চিরাইয়া’
‘চিরাইয়া’ ওয়েব সিরিজের একটি দৃশ্য। ছবি: স্ক্রিনশট

ভারতে বৈবাহিক ধর্ষণ এখনো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ ‘চিরাইয়া’। জিও হটস্টারে গত মার্চে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই সিরিজটি লাখ লাখ দর্শকের কাছে পৌঁছেছে। ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এই হিন্দি শোটি কেবল বিনোদন নয়, বরং দেশটির গভীর পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার এক অন্ধকার ও অমানবিক দিককে সাহসিকতার সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।

হিন্দি শব্দ ‘চিরাইয়া’ বা ‘ছোট পাখি’ নাম থেকেই বোঝা যায় এটি শৃঙ্খলিত স্বপ্নের কথা বলে। সিরিজটির মূল দুই চরিত্র কমলেশ (দিব্যা দত্তা) এবং পূজা (প্রসন্ন বিশত)। পূজা একজন উচ্চশিক্ষিত, সচেতন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারী, যে জেন্ডার সমতায় বিশ্বাস করে। তার স্বপ্নগুলো তছনছ হয়ে যায় যখন বিয়ের প্রথম রাতেই সে স্বামী অরুণের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়।

যখন পূজা এই পাশবিকতার প্রতিবাদ করে, অরুণ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেয় যে সে কেবল ‘নিজের অধিকারে থাকা সম্পদ’ ভোগ করেছে। অরুণের এই সংলাপ ভারতের সেই রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে যেখানে বিয়ের বন্ধনকে নারীর ওপর পুরুষের নিরঙ্কুশ মালিকানা হিসেবে দেখা হয়। সিরিজে দেখা যায়, যখন নির্যাতিত পূজা পরিবারের কাছে সাহায্য চায়, তখন তার নিজের মা থেকে শুরু করে শাশুড়ি—সবাই তাকে ‘মানিয়ে নেওয়ার’ এবং ‘সংসারের শান্তির স্বার্থে চুপ থাকার’ পরামর্শ দেয়। কমলেশ, যে নিজেও সারা জীবন পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে ঘরকন্নাকে নারীর একমাত্র কাজ বলে মেনে নিয়েছিল, একপর্যায়ে তার নৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে পূজার লড়াইয়ের প্রধান সহযোদ্ধা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হয়ে ওঠে।

ভারতের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৬ দশমিক ১ শতাংশ বিবাহিত নারী স্বামীর মাধ্যমে যৌন সহিংসতার শিকার হন। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং সৌদি আরবের মতো ভারতও বিশ্বের সেই কয়েক ডজন দেশের একটি যেখানে বৈবাহিক ধর্ষণকে এখনো আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না।

আইনি বাধার প্রধান কারণ:

ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক আইন: ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারার ২ নম্বর ব্যতিক্রম অনুযায়ী, স্ত্রী নাবালিকা না হলে স্বামী কর্তৃক জোরপূর্বক যৌন মিলনকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হবে না। এই আইনটি দেড় শ বছরের বেশি পুরোনো।

সরকারের অবস্থান: ভারত সরকার এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের মতে, এটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করলে ‘বিয়ের পবিত্রতা’ নষ্ট হবে এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তাদের মতে, এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ।

পুরুষ অধিকারকর্মীদের দাবি: অনেক পুরুষ অধিকার কর্মী ও আইনজীবী মনে করেন, এমন আইন হলে নারীরা বিচ্ছেদের সময় বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এর অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা করতে পারে।

শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা

সিরিজটির চিত্রনাট্যকার দিব্য নিধি শর্মা এবং পরিচালক শশান্ত শাহর মতে, ভারতের উত্তরাঞ্চলের চরম পুরুষতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল পরিবেশকে তুলে ধরতেই এই সিরিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি মূলত জনপ্রিয় বাংলা ওয়েব সিরিজ ‘সম্পূর্ণা’র হিন্দি সংস্করণ। তাঁদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়, বরং সমাজের গভীর স্তরে প্রোথিত নারীবিদ্বেষী মানসিকতাকে একটি আয়না দেখানো। পরিচালক শাহর মতে, সিরিজে পুরুষ চরিত্রগুলোকে কেবল ‘দানব’ হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং নিয়মিত মানুষের রূপেই চিত্রিত করা হয়েছে, যারা জানেই না যে তারা কতটা নারীবিদ্বেষী।

প্রখ্যাত অভিনেত্রী দিব্যা দত্তা বলেন, ‘বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে কথা বলা আমাদের সমাজে বড় একটি ট্যাবু। অনেক নারীই মনে করেন এটি কেবল তার একার যন্ত্রণা এবং মুখ খুললে তাকেই কলঙ্কিত হতে হবে। “চিরাইয়া” সেই দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা ভাঙার একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ।’

সিরিজটি মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্মতি (Consent) এবং মিসোজিনি (নারীবিদ্বেষ) নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্র সমালোচকেরা বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রশংসা করলেও, রক্ষণশীল ও ট্রলকারীদের পক্ষ থেকে এটিকে ‘পুরুষবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে বয়কটের ডাকও দেওয়া হয়েছে।

গত বছর ভারতে একটি ঘটনার পর দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, যখন স্ত্রীকে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত এক ব্যক্তি আপিলে মুক্তি পান। কারণ, আদালত জানান, ভারত বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। বর্তমানে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জন্য একাধিক পিটিশন জমা থাকলেও আইনি ও সামাজিক বাধার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে আছে। এ অবস্থায় ‘চিরাইয়া’র মতো প্রভাবশালী সৃজনশীল কাজগুলো হয়তো রাতারাতি আইন বদলাবে না, তবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত