Ajker Patrika

অস্কার মঞ্চে ফিলিস্তিন থেকে এআই: গ্ল্যামারের রাতে প্রতিবাদের গর্জন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১১: ১৭
অস্কার মঞ্চে ফিলিস্তিন থেকে এআই: গ্ল্যামারের রাতে প্রতিবাদের গর্জন
অস্কার মঞ্চে বিজয়ীরা। ছবি: এএফপি

জমকালো আয়োজন, তারকার মেলা আর রেড কার্পেটের চাকচিক্য—সবই ছিল চিরাচরিত অস্কারের মতো। কিন্তু ৯৮ তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চ শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না; বরং এটি হয়ে উঠল যুদ্ধ, রাজনীতি এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক বলিষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম। রোববার (১৫ মার্চ) রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত ৯৮ তম এই আসরে স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, হলিউড এখন আর বিশ্বরাজনীতির বিভীষিকা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারছে না।

চলতি বছরের অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের মুকুট জিতে নিয়েছে পল থমাস অ্যান্ডারসনের মহাকাব্যিক সিনেমা ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। অভিবাসন সংকট এবং একটি নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের গল্প নিয়ে নির্মিত এই ছবিটি সেরা পরিচালক, সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্য এবং সেরা সম্পাদনাসহ মোট ছয়টি বিভাগে পুরস্কার জিতে নিয়েছে। বিশেষ করে ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা শন পেন।

সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার নিতে এসে পল থমাস অ্যান্ডারসন তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি এই সিনেমাটি আমার সন্তানদের জন্য লিখেছি, আমাদের রেখে যাওয়া এই অগোছালো পৃথিবীর জন্য তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে। তবে আমার বিশ্বাস, এই প্রজন্মই বিশ্বে সুশাসন ও শালীনতা ফিরিয়ে আনবে।’

‘যুদ্ধকে না বলুন, ফিলিস্তিনকে মুক্ত করুন’

পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে সবচেয়ে সাহসী মুহূর্তটি আসে যখন জনপ্রিয় অভিনেতা হ্যাভিয়ের বারদেম ‘সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম’ বিভাগের পুরস্কার ঘোষণা করতে আসেন। তিনি প্রথাগত ভূমিকার বাইরে গিয়ে সরাসরি বলেন, ‘যুদ্ধকে না বলুন, ফিলিস্তিনকে মুক্ত করুন।’ তাঁর এই আহ্বানে পুরো ডলবি থিয়েটার করতালিতে ফেটে পড়ে।

নরওয়ের পরিচালক জোয়াকিম ট্রায়ার তার ছবি ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’-এর জন্য সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার গ্রহণ করার সময় বিশ্বনেতাদের সমালোচনা করে বলেন, ‘শিশুদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব বড়দেরই নিতে হবে। এমন কোনো রাজনীতিবিদকে ভোট দেবেন না যারা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দেন না।’

বর্ণবাদ ও বৈচিত্র্যের জয়

রায়ান কুজলারের ‘সিনার্স’ চারটি অস্কার জিতেছে, যার মধ্যে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন মাইকেল বি জর্ডান। তিনি তাঁর বক্তব্যে সিডনি পোয়াটিয়ে, ডেনজেল ওয়াশিংটন ও হ্যালি বেরির মতো কৃষ্ণাঙ্গ আইকনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। অন্যদিকে, অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম বিভাগে জয়ী ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’-এর সহ-পরিচালক ম্যাগি ক্যাং অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘এতদিন পর বড় পর্দায় আমাদের (কোরীয়দের) প্রতিনিধিত্ব দেখতে পাওয়া অনেক বড় প্রাপ্তি। আগামী প্রজন্মকে আর নিজেদের পরিচয়ের জন্য হাহাকার করতে হবে না।’

বন্দুক সহিংসতা ও এআই বিতর্ক

এবারের অস্কারে নেটফ্লিক্সের ডকুমেন্টারি শট ‘অল দ্য এম্পটি রুমস’ বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্কুলে বন্দুক হামলায় নিহত শিশুদের খালি ঘরের দৃশ্য নিয়ে নির্মিত এই ছবির পক্ষ থেকে গ্লোরিয়া ক্যাজারেস বলেন, ‘বন্দুক সহিংসতা এখন শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবী যদি এই খালি শোবার ঘরগুলো দেখত, তবে আমেরিকা আজ অন্যরকম হতো।’

মঞ্চে ‘মিস্টার নোবডি অ্যাগেইনস্ট পুতিন’ ছবির নির্মাতারাও রাশিয়ার অলিগার্ক বা ধনকুবেরদের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এ ছাড়া, অভিনেতা উইল আর্নেট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহারের সমালোচনা করে বলেন, ‘অ্যানিমেশন কোনো যান্ত্রিক কমান্ড নয়, এটি একটি শিল্প যা রক্ষা করা প্রয়োজন।’

এক নজরে ৯৮ তম অস্কারের মূল বিজয়ীরা:

  • সেরা চলচ্চিত্র: ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার
  • সেরা পরিচালক: পল থমাস অ্যান্ডারসন
  • সেরা অভিনেতা: মাইকেল বি জর্ডান (সিনার্স)
  • সেরা পার্শ্ব অভিনেতা: শন পেন (ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার)
  • সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম: সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু (নরওয়ে)
  • সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার: কে-পপ ডেমন হান্টার্স
  • সেরা ডকুমেন্টারি (শর্ট) : অল দ্য এম্পটি রুমস

সমাপনী বক্তব্যে সঞ্চালক কোনান ও’ব্রায়েন বলেন, ‘আমরা এক ভয়াবহ ও বিশৃঙ্খল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এমন সময়ে অস্কারের গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ এখানে ৩১টি দেশের হাজারো মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে এসে সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।’

৯৮ তম অস্কার শুধু বিজয়ীদের হাসির জন্য নয়, বরং বিশ্ববিবেকের কাছে রাখা কিছু কঠিন প্রশ্নের জন্যও ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত