Ajker Patrika

দেশে কমছে বিদেশি শিক্ষার্থী: ৫ কারণে কমেছে আসা

উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আসেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তাঁদের আসার হার কমতির দিকে। এ জন্য দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ও শিক্ষার মানে ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয়কে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে সমস্যা ধরে ধরে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছেন তাঁরা।

রাহুল শর্মা, ঢাকা 
আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৩৮
দেশে কমছে বিদেশি শিক্ষার্থী: ৫ কারণে কমেছে আসা
ফাইল ছবি

দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থী আসা ধারাবাহিকভাবে কমছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিদেশি শিক্ষার্থী কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি ও অন্যান্য খরচ কম। প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, ভুটানসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশে আসেন। কিন্তু শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান ও গ্রহণযোগ্যতায় ঘাটতি, সেশনজট, র‍্যাংঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাসহ মূলত পাঁচ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

ইউজিসি বলছে, কীভাবে দেশে বিদেশি শিক্ষার্থী বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩-এ। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের মার্চে। ২০২২ সালে দেশে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। বর্তমানে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ৪৫৯ জন। আগের বছর (২০২২ সাল) ছিল ১ হাজার ৯১৭ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি শিক্ষার্থী কমেছে ৪৯৮ জন বা ২৫ শতাংশের বেশি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত শুক্রবার ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, এ বিষয়ে ইউজিসির এক সভায় আলোচনা হয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে কমিশন। শিগগির বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিনিময় করে একটি কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। লক্ষ্য হলো, আঞ্চলিক শিক্ষা হাব হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো।

ইউজিসির বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে পাঁচটি বড় কারণ রয়েছে। এগুলো হলো শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান ও গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি, দীর্ঘ সেশনজট ও নির্ধারিত সময়ে ডিগ্রি শেষ না হওয়া, গবেষণার সীমিত সুযোগ এবং ভিসা ও প্রশাসনিক জটিলতা, র‍্যাংঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা।

ইউজিসির পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কোনো বছরই এক হাজার ছাড়ায়নি। ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ৮০৪ জন বিদেশি শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর সংখ্যাটি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১৯ সালে ছিলেন ৪৮২ জন, ২০২০ সালে ৭৬৭, ২০২১ সালে ৬৭৭, ২০২২ সালে ৬৭০ এবং ২০২৩ সালে ৬৩৩ জন। ২০২৩ সালে দেশের ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ২১টিতে ৬৩৩ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৪৬২ জন ছাত্র এবং ১৭১ জন ছাত্রী।

বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাইদুর রহমান গত শুক্রবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষাবর্ষ ও পরীক্ষা শেষ না হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে চার বছরের স্নাতক কোর্স শেষ করতে পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা যেমন নিরুৎসাহিত হন, তেমনি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিক্ষার্থী বিনিময় (স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ) কর্মসূচি পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)। সেখানে বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন ১১২ জন। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯১ জন, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ৮৭ জন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ জন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন।

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ জন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ৭ জন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬ জন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) ৪৬ জন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ জন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ জন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে ১৫ জনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন।

জানা যায়, একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়তেন। এ জন্য ‘স্যার পিজে হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হল’ নামে আলাদা একটি আবাসিক হলও করা হয়েছিল। বর্তমানে এই হলে হাতে গোনা বিদেশি শিক্ষার্থী থাকেন। বাকি কক্ষগুলোতে থাকেন তরুণ শিক্ষকেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের সূত্র বলছে, বর্তমানে পাঁচ শিক্ষাবর্ষ মিলিয়ে সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠে ৮৩ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও কমছে বিদেশি শিক্ষার্থী

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তবে এগুলোতেও বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে। ২০২৩ সালে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২টিতে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন মোট ৮২৬ জন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৮৭, ২০২১ সালে ১ হাজার ৬০৪, ২০২০ সালে ১ হাজার ৫৫০ এবং ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪৬৭ জন।

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিন, গাম্বিয়া, মরক্কো, কোরিয়া, নাইজেরিয়া, ইরান, তানজানিয়া, মিয়ানমার, রুয়ান্ডা, ইন্দোনেশিয়া, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, সিয়েরা লিওন, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, কেনিয়া, ঘানা, উগান্ডা, লাইবেরিয়াসহ ৩৭টি দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আসেন।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের একজন ঘানার কজো। তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতকোত্তর করছেন। তাঁর ভাষ্য, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এখানে ভর্তি ও খরচ তুলনামূলক কম। তাই এখানে ভর্তি হয়েছেন।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও শিক্ষার মান আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, এ ছাড়া ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রচারণা বাড়ানো, প্রশাসনিক জটিলতা কমানোসহ নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে পড়তে আগ্রহী হবেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত