Ajker Patrika

বেসরকারি মেডিকেল: টানা তিন বছর বেড়ে কমছে তিন বছর ধরে

মুহাম্মদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
বেসরকারি মেডিকেল: টানা তিন বছর বেড়ে
কমছে তিন বছর ধরে
প্রতীকী ছবি

সাশ্রয়ী টিউশন ফিসহ অন্যান্য সুবিধার জন্য একসময় দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে চিকিৎসা শিক্ষার অন্যতম গন্তব্য ছিল বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। কিন্তু তিন শিক্ষাবর্ষ ধরে বিদেশি শিক্ষার্থী ধারাবাহিকভাবে কমছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে চলতি শিক্ষাবর্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সাড়ে তিন হাজার আসন বরাদ্দের সুযোগ থাকলেও ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৪১ জন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশনের অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভারতে চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং দেশে কিছু নীতিগত বাধার কারণে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে। এতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিবেশ ও আন্তদেশীয় শিক্ষার্থী বিনিময়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, বিদেশি শিক্ষার্থী কমার বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে এবং পরিস্থিতি উত্তরণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে গঠিত বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএমইএসি) এরই মধ্যে অ্যাক্রেডিটেশন কার্যক্রম শুরু করেছে। ডব্লিউএফএমইর স্বীকৃতি মিললে দেশের চিকিৎসা শিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ বাড়বে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৯৮৬ সালে প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী আসা শুরু হয় নব্বই দশকের শেষ ভাগে। বর্তমানে ৭২টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ১২টি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ রয়েছে।

প্রতিবছর ভারত, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে ভর্তি হন। সাশ্রয়ী টিউশন ফি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়ার্ল্ড ডিরেক্টরি অব মেডিকেল স্কুলসে অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে।

অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা ও কোটা নির্ধারণ করা হয়। বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলো তাদের অনুমোদিত আসনের সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ রাখতে পারে।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব মেডিসিন ব্যাচেলর অব সার্জারি (এমবিবিএস) এবং ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি (বিডিএস) কোর্সে কলেজভেদে টিউশন ফি সাধারণত ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি)। এর বাইরে তাঁদের আবাসন, খাবার, পরীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় রয়েছে।

বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) হিসাবে, একজন বিদেশি শিক্ষার্থী এমবিবিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশে অবস্থানকালে গড়ে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় করেন। বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ছে।

বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির উত্থান-পতন

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন ১ হাজার ২১৮ জন। পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩৩ জনে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে আরও বেড়ে হয় ২ হাজার ১২ জন এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭৪ জনে পৌঁছায়। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬১৩ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ দশমিক ২ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে কমে হয় ১ হাজার ১৫৬ জন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১২৪ জন। এই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি কার্যক্রম চালানো ৬৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৬ হাজার ২৭৮টি এবং ১২টি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ৯৩৫টি আসন রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সাড়ে তিন হাজার আসন বরাদ্দের সুযোগ থাকলেও ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৪১ জন। তাঁদের মধ্যে মেডিকেল কলেজে ১ হাজার ১২৪ জন এবং ডেন্টাল কলেজে ১৭ জন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ফিলিস্তিন, মালয়েশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে পড়ছেন। প্রতি শিক্ষাবর্ষেই ভারতের শিক্ষার্থীই সিংহভাগ। ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ এই চার শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে মোটি ৬ হাজার ৮৩৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ভারতীয় শিক্ষার্থীই ৪ হাজার ৪৭৭ জন। ভারতের শিক্ষার্থীর সংখ্যাই কমেছে।

চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতীয় শিক্ষার্থী কমার কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং অনেক রাজ্যে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ফি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ। পাশাপাশি সীমিত আন্তর্জাতিক প্রচারণা, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সমন্বিত সহায়তা কাঠামোর ঘাটতি বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোকে তুলনামূলক কম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।

ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের (ডব্লিউএফএমই) সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আগে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে এসে মূলত এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি বিবেচনা করতেন, এখন তাঁরা ভর্তির আগে দেখেন, এখানকার চিকিৎসা শিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কতটা এবং ভবিষ্যতে নিজ দেশে নিবন্ধন, উচ্চশিক্ষা বা পেশাগত প্রশিক্ষণে কোনো সমস্যা হবে কি না। বর্তমানে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের একটি জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষ থাকে। সেই কর্তৃপক্ষ ডব্লিউএফএমইর স্বীকৃতি পেলে সংশ্লিষ্ট দেশের চিকিৎসা শিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়ায় এগোলেও তা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তিনি মনে করেন, বিদেশি শিক্ষার্থী বাড়াতে হলে চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন সম্পন্ন করা জরুরি।

অবশ্য ডব্লিউএফএমইর স্বীকৃতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নেতিবাচক প্রচারণা, ভারতে মেডিকেল কলেজ ও আসন বৃদ্ধি, বাংলাদেশে ভর্তির অতিরিক্ত জিপিএ শর্ত এবং বিকল্প দেশগুলোতে সহজ ভর্তি—এসব মিলিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী কমেছে।

বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে এবং পরিস্থিতি উত্তরণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের মেডিকেল কলেজগুলো মূলত দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য। তবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আমরা সব সময় স্বাগত জানাই। তাঁদের উপস্থিতি একাডেমিক পরিবেশ সমৃদ্ধ করে, চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়তা করে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখে। বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাস্তবতা কাজ করেছে। পাশাপাশি ভারত ও নেপাল তাদের শিক্ষার্থীদের বিদেশে চিকিৎসা শিক্ষায় নিরুৎসাহিত করছে।’

ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘মেডিকেল কলেজগুলো এখনো ডব্লিউএফএমইর স্বীকৃতির আওতায় আসেনি। এ জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএমইএসি) গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিএমইএসি কয়েকটি কলেজকে অ্যাক্রেডিটেশন দিয়েছে। ডব্লিউএফএমইর প্রতিনিধিরা অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে গেছেন। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের মধ্যেই বিএমইএসি ডব্লিউএফএমই’র স্বীকৃতি পাবে বলে আশা করছি। চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত