Ajker Patrika

ভরপেট বিরিয়ানির পর তরমুজ, একে একে প্রাণ হারাল একই পরিবারের ৪ সদস্য

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভরপেট বিরিয়ানির পর তরমুজ, একে একে প্রাণ হারাল একই পরিবারের ৪ সদস্য
মুম্বাইয়ে বিরিয়ানির পর তরমুজ খেয়েছিল এক পরিবার। এরপর, একে একে চার সদস্যই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ছবি: সংগৃহীত

শনিবার রাতটা ছিল একেবারে স্বাভাবিক। ১৩ বছরের জয়নব পরিবারের সবার সঙ্গে বসে বিরিয়ানি খেয়েছিল। পাশে ছিল বড় বোন, বাবা-মা আর আত্মীয়স্বজন। রাত গড়িয়ে একটু মধ্যরাত পেরোতেই ডেজার্ট বা মিষ্টান্ন হিসেবে কাটা হলো তরমুজ। এরপর যা ঘটল, তা যেন ধীরে ধীরে নামা এক অদৃশ্য অন্ধকার। পরদিন সকালেই শুরু হলো ভয়াবহ উপসর্গ। চিকিৎসা শুরু হলেও কিছুতেই কাজ হলো না। পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে একে একে মারা গেলেন চারজন।

পুলিশ জানিয়েছে, এই চারজনের মৃত্যু সন্দেহজনক খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে হয়েছে।

গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ৪০ বছর বয়সী মোবাইল এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আবদুল কাদের তাঁর স্ত্রী নাসরিন এবং ১৩ ও ১৬ বছর বয়সী তাদের দুই মেয়ে জয়নব ও আয়েশা এবং আরও পাঁচ আত্মীয়ের সঙ্গে রাতের খাবারের জন্য একত্র হয়েছিলেন। খাবারের তালিকায় ছিল বিরিয়ানি। খাওয়া-দাওয়া শেষে তারা পায়ধোনির বাসায় ফিরে যান।

সেই সময় পর্যন্ত কারও শরীরে কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়নি। বাসায় ফিরে রাত প্রায় ১টার দিকে তারা তরমুজ খান। ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ করেই তারা অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। শুরু হয় বমি ও ডায়রিয়া। প্রথমে একজন স্থানীয় চিকিৎসক তাদের দেখেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাদের জে জে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ছোট মেয়ে জয়নব সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে মারা যায়। এরপর তাঁর মা নাসরিন (৩৫) এবং বড় বোন আয়েশা (১৬) চিকিৎসায় সাড়া না দিয়ে মারা যান। বাবা আবদুল্লাহ (৪০) রাত ১০টা ৩০ মিনিটের দিকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

প্রাথমিকভাবে তাদের পরীক্ষা করা চিকিৎসক ডা. জিয়াদ কুরেশি বলেন, রোগীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ এবং তাদের ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ডা. জিয়াদ বলেন, ‘তাদের প্রচণ্ড বমি ও ডায়রিয়া হচ্ছিল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা আমাকে জানিয়েছিল যে তারা তরমুজ খেয়েছিল।’

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের চার সদস্যের এই মৃত্যুর পেছনে খাদ্যে বিষক্রিয়া সন্দেহ করা হলেও পুলিশ একটি অর্ধেক খাওয়া তরমুজের অংশ জব্দ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে। মুম্বাই পুলিশের উপকমিশনার প্রবীণ মুন্ডে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের সময় সংগ্রহ করা দেহের নমুনাও আরও তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।’

তদন্তে যুক্ত হয়েছে ফরেনসিক ও খাদ্য বিভাগ। রাজ্যের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন খতিয়ে দেখছে, তারা যে তরমুজ খেয়েছিল তাতে কোনো বাহ্যিক বিষাক্ত পদার্থ বা ভেজাল ছিল কি না। অন্যদিকে ফরেনসিক দল খাবারের নমুনা ও ভিসেরা রিপোর্টের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করবে।

জে জে হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ সংক্রমণ বা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে টিস্যুগুলো হিস্টোপ্যাথোলজি পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে। হিস্টোপ্যাথোলজি রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে মতামত সংরক্ষিত থাকবে।

এদিকে, পুষ্টিবিদ রুপালি দত্তের মতে—তরমুজ ফুড পয়জনিং বা খাদ্য বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এটি গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, তরমুজে প্রচুর পরিমাণে পানি এবং প্রাকৃতিক চিনি থাকায় এতে ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এ ছাড়া মিষ্টি বা উজ্জ্বলতা বাড়াতে তরমুজে গ্লুকোজ বা চিনির পানি ইনজেকশন দেওয়ার বেশ কিছু অভিযোগ ও খবর পাওয়া গেছে। রুপালি দত্তের মতে, যদি কোনো দূষিত তরমুজে এই ধরনের তরল প্রবেশ করানো হয়, তবে তা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ডায়েটিশিয়ান এবং ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ড. অর্চনা বাত্রার মতে, ঝুঁকি তখনই তৈরি হয় যখন ফলটি সালমোনেলা, লিস্টেরিওসিস বা ই-কোলাই সংক্রমণের মতো ক্ষতিকারক জীবাণু দ্বারা দূষিত হয়। এই সংক্রমণগুলো থেকে তীব্র পানিশূন্যতা, সেপসিস (রক্তে সংক্রমণ) বা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হতে পারে।

তরমুজ সংক্রান্ত ফুড পয়জনিং খুব একটা বিরল নয়, যার ফলে সাধারণত ডায়রিয়া, বমি এবং পেটে ব্যথা হয়ে থাকে। তবে এর তীব্রতা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা দূষক দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন এবং কত দ্রুত চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাচ্ছে। চরম পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তীব্র ডায়রিয়া ও পেটের সমস্যা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রুপালি দত্ত সতর্ক করে বলেন, ল্যাব টেস্ট বা পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো খাবারকে দায়ী করা কঠিন। খাদ্য বিষক্রিয়া দূষিত ফল, অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাবার নাড়াচাড়া করা কিংবা অনিরাপদ পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ খাবার জমিয়ে রাখার ফলেও হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত