Ajker Patrika

প্যাডেলচালিত স্টিমার: সংস্কারে ২ কোটি ব্যয়ের পর ভাড়া খাটছে পিএস মাহসুদ

  • পর্যটক-সংকটে নিয়মিত চলছে না পিএস মাহসুদ
  • ট্যুর অপারেটরের কাছে ভাড়া বিআইডব্লিউটিসির
  • ভাড়ায় যাওয়ার পর ছয় মাসে চলেছে ১০ ট্রিপ
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
প্যাডেলচালিত স্টিমার: সংস্কারে ২ কোটি ব্যয়ের পর 
ভাড়া খাটছে পিএস মাহসুদ
যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে ছুটছে স্টিমার ‘পিএস মাহসুদ’। সম্প্রতি রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বিলুপ্তপ্রায় প্যাডেলচালিত স্টিমার বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকলেও দৃশ্যত এ দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। বাংলাদেশে অবশিষ্ট মাত্র চারটি প্যাডেল স্টিমারের অন্যতম পিএস মাহসুদকে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঐতিহ্যবাহী এই সরকারি জলযানকে ঘটা করে পর্যটনসেবায় ফিরিয়ে আনা হলেও অল্পদিন পরই বেসরকারি ট্যুর অপারেটরের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। কিন্তু পর্যটকস্বল্পতায় নিয়মিত চলছে না নৌপথের সোনালি যুগের স্মৃতিবাহী এই স্টিমার।

মেরামত এবং কয়েক দফা পরীক্ষামূলক চলাচলের পর ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর তৎকালীন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে পিএস মাহসুদের যাত্রার উদ্বোধন করেছিলেন। সে সময় এটিকে দেশের নদীপথের ঐতিহ্যবাহী জলযান হিসেবে নতুনভাবে বিশেষ পর্যটনসেবায় যুক্ত করার কথা জানানো হয়। তবে উদ্বোধনের পর কয়েক দফা ভ্রমণসূচি ঘোষণা করা হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় নির্ধারিত গন্তব্যে ট্রিপ পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। অথচ সারা বিশ্বে অতিবিরল এককালের এই বাষ্পীয় পোতগুলো যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে পর্যটকদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়।

যাত্রীদের আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) নিজেরা পরিচালনার পরিবর্তে জাহাজটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বিআইডব্লিউটিসির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, পিএস মাহসুদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব যাত্রীসংকটের অন্যতম কারণ।

২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরস’ নামের একটি বেসরকারি ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কাছে পিএস মাহসুদকে ভাড়া (চার্টার্ড) দেওয়া হয়। বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, দুই বছরের জন্য জাহাজটি হস্তান্তর করা হয়েছে। এর বিপরীতে ট্যুর অপারেটরকে মাসে ৪ লাখ ২৫ হাজার ১০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী ছয় মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে জমা রাখতে হয়েছে।

তবে চুক্তির প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও স্টিমারটির চলাচল নিয়মিত হয়নি। জানা গেছে, রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরস এ সময়ে মাত্র ১০টি ট্রিপ চালিয়েছে। গত মে মাসে এক দিনও স্টিমারটি চলেনি। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, জনসাধারণের ভ্রমণ ও ঐতিহ্যপ্রেমী শ্রেণির মধ্যে আগ্রহ থাকার পরও প্রচারের অভাবসহ অন্যান্য কারণে তাঁরা এই বিরল যানে চড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ বেশ কিছু বেসরকারি নৌযান দেশের নদী ও হাওরগুলোতে পর্যটকদের নিয়ে নিয়মিত ভ্রমণ পরিচালনা করে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্যিক) এস এম আশিকুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিসির কাছে বর্তমানে চারটি ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে পিএস মাহসুদ শতবর্ষী। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর একে শুধু পর্যটনসেবার জন্য আবার চালু করা হয়েছে। কারণ, বেশ পুরোনো বলে এগুলোকে আর বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করার অনুমতি নেই। সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালানোর মতো বাস্তবতা নেই বলেই বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালনা করা হচ্ছে। এগুলো আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। এ জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।’

পিএস মাহসুদের সংস্কারে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি বিআইডব্লিউটিসি। সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেরামত ও আধুনিকায়নে ২ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে থাকতে পারে। তবে পরিচালক এস এম আশিকুজ্জামানের দাবি, এই ব্যয় ১ কোটির বেশি হওয়ার কথা নয়।

বিআইডব্লিউটিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, পিএস মাহসুদ কোথা থেকে, কখন এবং কোন রুটে চলাচল করে, সে বিষয়ে অনেক সম্ভাব্য যাত্রী জানেন না। তাঁদের মতে, ভাড়া নেওয়া প্রতিষ্ঠান নিজেরা ছাড়াও গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন নৌঘাট কর্তৃপক্ষ এবং ভ্রমণসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে প্রচার চালানো প্রয়োজন। কারণ, অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা জানেন, পিএস মাহসুদ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে।

বর্তমানে জাহাজটিতে প্রায় ৩২৩ জন পর্যটক ভ্রমণ করতে পারেন। ট্যুর অপারেটরের তথ্য অনুযায়ী, দিনব্যাপী প্যাকেজে একসঙ্গে প্রায় ২০০ জন পর্যটক ভ্রমণ করতে পারেন। ১৫০ জনের কম যাত্রী হলে ট্রিপ পরিচালনা আর্থিকভাবে লাভজনক হয় না। অন্যদিকে রাতের প্যাকেজে প্রায় ৪০ জন পর্যটকের ব্যবস্থা রয়েছে।

রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরসের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হেলাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পিএস মাহসুদ পরিচালনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পর্যটকের স্বল্পতা। পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে ট্রিপ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আর জাহাজটির পরিচালন ব্যয় ও জনবলের প্রয়োজন সাধারণ লঞ্চের তুলনায় অনেক বেশি। একটি ট্রিপ লাভজনক করতে ১৫০ থেকে ২০০ যাত্রীর প্রয়োজন হয়। সংরক্ষিত ঐতিহ্য বলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এটি শুধু পর্যটনের কাজে ব্যবহার করা যায়, সাধারণ যাত্রী পরিবহনে নয়।’

১৯২২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে পিএস মাহসুদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধাপে এর আধুনিকায়ন করা হয়। বাংলাদেশ আমলে ১৯৮৩ সালে নারায়ণগঞ্জের একটি ডকইয়ার্ডে সেকেলে স্টিম ইঞ্জিনের পরিবর্তে আধুনিক ডিজেলচালিত ইঞ্জিন স্থাপন করা হয়। পরে ১৯৯৫ সালে এটিকে মেকানিক্যাল গিয়ার সিস্টেমে রূপান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ২০২২ সালে জাহাজটির নিয়মিত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এই অঞ্চলে বাষ্পচালিত স্টিমারের যাত্রা শুরু হয়। এগুলো কয়লার আগুনে উৎপন্ন হওয়া বাষ্পের (স্টিম) শক্তিতে চলত। এ কারণেই এগুলোর নাম ছিল স্টিমার। যেসব নৌযানের দুই পাশে বড় চাকা বা প্যাডেল থাকত, তাদের বলা হতো প্যাডেল স্টিমার। গতি অনেক বেশি হওয়ায় দেশের মানুষের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায় ‘রকেট স্টিমার’।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মীর তারেক আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পিএস মাহসুদের মতো শতবর্ষী জাহাজ পরিচালনা দীর্ঘ মেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যথাযথ প্রচার ও পরিকল্পনা থাকলে এ রকম ঐতিহ্যবাহী জাহাজ রিভার ট্যুরিজমে ভালো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে ভাড়া নিয়ে মাঝে মাঝে চালানো হচ্ছে। কিন্তু নিয়মিত না চলাচল না করলে এর ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তখন আবারও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে মেরামত করতে হতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত