‘আপনি কোন দলের সমর্থক?’ চায়ের কাপটি আমার সামনে নামিয়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন বন্ধুপত্নী। কিছুদিন আগের কথা। বিশ্বকাপ নিয়ে বাঙালি-আবেগ একেবারে তুঙ্গে—তা সে ঢাকাতেই হোক কিংবা লন্ডনে। আমি এসেছি বন্ধুর বাড়িতে একটু গল্প করতে, একটু চা খেতে। মাঝেমধ্যেই আসি এখানে। দম্পতিটি ভারী পছন্দের আমার—স্বামী, স্ত্রী দুজনেই। দীর্ঘদিনের পরিচয়। স্বামীটি আমার ছোটবেলার বন্ধু—স্ত্রীটিও পরিচিত ৫০ বছর ধরে, তাঁদের বিয়ের সময় থেকে। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে তাঁদের—দুজনেই সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনে। ভারি নিটোল শিক্ষিত, রুচিশীল এবং মায়াময় একটি পরিবার।
বন্ধুপত্নীর প্রশ্ন শুনে বন্ধুর চোখে চোখ রাখি, একটু মৃদু কাশি, বাইরে চোখ ফিরিয়ে ঢাকার শেষ বিকেলের এলিয়ে পড়া ডিম-কুসুম রঙের রোদ দেখি। জানি, এ প্রশ্ন একটি সাদামাটা সরল নির্দোষ প্রশ্ন নয়। এত দিনে শিখে গেছি যে এর পরতে পরতে জিলেপির প্যাঁচ আছে। আমার সর্বতো মূল্যায়ন এই প্রশ্নে আমার উত্তরের ভিত্তিতেই হবে। সুতরাং সাবধান হয়ে গেলাম। মনে মনে আমার কৌশল ঝালিয়ে নিতে থাকি। বুঝতে পারি, এ প্রশ্নের তিনটি সম্ভাব্য জবাব হতে পারে।
প্রথমত, আমি সত্যি কথাটাই বলতে পারি যে আমি কোনো দলের সমর্থক নই। কারণ, ফুটবলে আমার উৎসাহ বড় কম। কিন্তু এটি আমার জন্য সাতিশয় বিপজ্জনক। এটা বললে বন্ধুপত্নী হয়তো ভাববেন যে আমি সৃষ্টিছাড়া এক লোক। বর্তমান বিশ্বে আমি বেমানান। সমাজে আমার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হব আমি। কেউ কেউ আমাকে নির্বোধও ভাবতে পারেন। ‘নির্বোধ’ প্রশ্নে কারও কারও শঙ্খ ঘোষের ‘পাগল’ কবিতার চার লাইনও মনে হতে পারে—
‘হাওড়া ব্রিজের চূড়োয় উঠুন,
নীচে তাকান ঊর্ধ্বে চান—
দুটোই মাত্র সম্প্রদায়
নির্বোধ আর বুদ্ধিমান।’
দ্বিতীয়ত, বানিয়ে বানিয়ে আমি যেকোনো একটি দেশের সমর্থক বনে যেতে পারি। যেমন বলতে পারি, আমি জার্মানির সমর্থক। ওই দেশটি যে খেলছে, অন্তত সেটুকু জানি। কিন্তু সেখানে বিপদ হচ্ছে যে বন্ধুপত্নী যদি সে দেশটির সমর্থক না হন, তাহলে দ্বিতীয় কাপ চা মিলবে না এই সন্ধ্যায়। খাবারের কথা তো দূরের কথা। সে এক বিরাট ক্ষতি আমার জন্য। কারণ, বন্ধুপত্নী ডাকসাইটে রাঁধুনি। আজ সন্ধ্যায় এটা-সেটা চাখব ভেবেছিলাম। একটি বিরূপ জবাব দিয়ে সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করতে পারি না। সুতরাং এ কৌশলও বাদ।
তৃতীয়ত, তাঁর প্রশ্ন তাঁকেই ফিরিয়ে দেওয়া। আমিই তাঁকে জিজ্ঞেস করতে পারি, তিনি কোন দলের সমর্থক এবং তাঁর উত্তরটা জেনে নিয়ে সেটাই তাঁকে ফেরত দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। হ্যাঁ, এটিই হবে আমার কৌশল। বড় আরাম বোধ করলাম।
এরপর স্মিতমুখে বন্ধুপত্নীর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনি তো খেলা সম্পর্কে অনেক জানেন। আপনি কোন দলের সমর্থক?’ এই স্বীকৃতিতে তাঁর চোখে সন্তুষ্টির আভা দেখা যায় একটা। ‘আমি?’ স্বামীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটু গর্বিত গলায় বললেন, ‘আমি তো আর্জেন্টিনার সমর্থক।’ পেয়ে গেছি আমার উত্তর। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘বলেন কী! আমিও তো’। সারা মুখ
তাঁর উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তাই! আমার ব্যাপারে পরম সন্তুষ্ট তিনি, ‘মেসি খুব ভালো না?’
এবার একটু বিপদ ঘনায় আমার। কিছুতেই ‘মেসি’ কে? তা মনে করতে পারি না। বারবার মনে হতে থাকে নিউইয়র্কের বিরাট কিংবদন্তি দোকান ‘মেইসি’র কথা। ঈশ্বর আমাকে বাঁচিয়ে দেন।
সে মুহূর্তে মনে পড়ে যায় একটি নাম—‘ম্যারাডোনা’। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠি, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। মেসি তো ম্যারাডোনারই যোগ্য উত্তরসূরি।’ বন্ধুপত্নীর অবয়বের প্রসন্নতায় বুঝতে পারি, আমি ছক্কা হাঁকিয়েছি।
‘কী যে সুন্দর কথা বলেছেন’, উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন বন্ধুপত্নী। ‘শুনুন, আপনি রাতে খেয়ে যাবেন কিন্তু’, আহ্লাদের আদুরে গলায় বলেন তিনি। ‘তারপর আমরা সবাই মিলে আর্জেন্টিনা আর অস্ট্রিয়ার খেলা দেখি টিভিতে।’ আবারও সতর্ক হয়ে বন্ধুপত্নীর প্রস্তাব আমি বিবেচনা করি। প্রস্তাবের প্রথম অংশ প্রত্যাখ্যান করার প্রশ্নই ওঠে না। বন্ধুপত্নীর রন্ধনকুশলতা জনে জনে জানা। বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে
এ বাড়ির মেরুকরণের কারণে প্রস্তাবের দ্বিতীয় অংশ থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
‘খেয়ে যাব নিশ্চয়। আপনার হাতের রান্না খেয়ে যাব না, তা কি হয় নাকি?’ আশ্বস্ত করি বন্ধুপত্নীকে। ‘কিন্তু খেলার জন্য তো থাকতে পারব না। আগেই যে অমুককে কথা দিয়েছি, ওর সঙ্গে বসে খেলা দেখব। আর্জেন্টিনার আরেক গোঁড়া সমর্থক কিনা!’ জানাই তাঁকে। কথা আমার মাটিতে পড়তে পারে না, তার আগেই সেটা ধরেন বন্ধুপত্নীটি। ‘হতেই হবে। যাদেরই একটু-আধটু বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, তারাই আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবে।’ আড়চোখে ভ্রু-ভঙ্গি করলেন ভদ্রমহিলা, স্বামীর দিকে তাকিয়ে। তারপর হৃষ্ট মুখে উঠে গেলেন আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে।
পর্দার আড়ালে স্ত্রীর চেহারাটি মিলিয়ে যেতেই বন্ধুটি আমার ওপর রাগে ফেটে পড়ল। ‘ফুটবল খেলার তুই কী বুঝিস? খালি বড় বড় কথা বললি! ইশ্, আবার কিনা আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছেন উনি’, ব্যঙ্গ করে বলার সঙ্গে সঙ্গে তার পত্নীর ভ্রাতা আখ্যা দিয়ে
সে এমন একটা সম্বোধন করে আমাকে, যা কহতব্য নয়। ‘আহা, রাগিস কেন?’ বন্ধুকে শান্ত করার চেষ্টা করি। ‘তার চাইতে তুই-ই আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে যা না, তাহলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যায়’, পথ বাতলাই তাকে। ‘কভি নেহি’, রাগের চোটে তার স্বর চড়ে এবং ভাষাও বিজাতীয় হয়ে যায়। ‘নীতির প্রশ্নে কোনো আপস নেই’, দার্ঢ্য কণ্ঠে বলে সে। ‘নীতির প্রশ্নে কোনো আপস নেই, সে ভালো কথা। কিন্তু তা তো ঘরের মধ্যে চলে না ভাই’, বোঝাই বন্ধুকে। ‘ঘরনির ক্ষেত্রে বলতে হবে, আপসের ক্ষেত্রে কোনো নীতি নেই। তবেই না ঘরের শান্তি বজায় থাকবে।’ সে শোনে, কিন্তু তবু গোঁজ হয়ে থাকে।
তারপরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। খেলার সূত্র ধরে খাবার টেবিলটাই বাগ্বিতণ্ডার একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। টের পাই, সেই সঙ্গে চলতে থাকে স্নায়ুযুদ্ধ। খেতে খেতে বুঝতে পারি যে বন্ধুপত্নী এবং বন্ধুর চলমান কথা-কাটাকাটিতে পুরো খাবার টেবিলটাই একটি ফুটবল মাঠে পরিণত হয়েছে। একজন আরেকজনকে ‘কর্নার’ করছে, ‘ট্যাকল’ করছে এবং ‘ফাউল’ও করেছে। শুধু ‘গোল’ করার বাসনায়। পুরো প্রক্রিয়ায় আমি ‘লাইনসম্যানের’ কাজ করেছি, কিন্তু ‘রেফারির’ দায়িত্ব পালন করিনি।
সবকিছুর পরে বেরিয়ে এসেছি পথে, বাড়িই আপাতত গন্তব্যস্থল। মনে মনে ভাবলাম, বিশ্বকাপ তো আমাদের আগাপাছতলা গ্রাস করেছে—ঢুকে পড়েছে আমাদের অন্দর মহলে সুতানলি সাপের মতন। ঠিক সে সময়ে মুঠোফোনের নীলচে পর্দায় ভেসে উঠল ছোট্ট খবর, আর্জেন্টিনা প্রথম গোলটি করেছে। গোলটি দিয়েছেন মেসি। বাড়ির দরজায় যখন আমি তালা খুলছি, তখনই মুঠোফোনে দেখি, অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গোলটি হলো। কে দিল? কে আবার? ওই ব্যাটা মেসিই।
বুঝতে পারলাম যে আমার বন্ধুর বাড়িতে এতক্ষণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভাগ্যিস, ঠিক সময়ে বন্ধুগৃহ ত্যাগ করেছি। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম একটা। বাঁচা গেল। আমি বাঁচলাম হয়তো, কিন্তু আমার বন্ধুটি?

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস মূলত অধিকার, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষের মুক্তি, বৈষম্যের অবসান এবং একটি জবাবদিহিমূল
২০ ঘণ্টা আগে
আসুন, আপনাদের সঙ্গে কয়েকজন বীরপুঙ্গবের পরিচয় করিয়ে দিই। এরা বরিশাল নগরীর জগদীশ সারস্বত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করত। এই উত্ত্যক্তকারীদের চারজনকে পুলিশ আটক করেছে। স্কুলের সামনে এসে ছাত্রীদের অশ্লীল ভাষায় উত্ত্যক্ত করার সময় এরা কী ধরনের আনন্দ পেত, জানতে পারলে
২০ ঘণ্টা আগে
কেপ ভার্দে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা মাত্র সাড়ে ৫-৬ লাখ মানুষের একটা পুঁচকে দ্বীপরাষ্ট্র। বছরখানেক আগেও বাংলাদেশের সিংহভাগ ফুটবলপ্রেমী হয়তো এই দেশটার নামও শোনেননি। না শোনাটাই স্বাভাবিক।
২ দিন আগে
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তৎপরতা চলছিল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটানো যায় কি না। যুদ্ধ শুরুর এক মাসের মাথায় উভয় পক্ষ শান্তি সমঝোতা খুঁজতে মিলিত হয়েছিল তুরস্কে।
২ দিন আগে