Ajker Patrika

মুনাফা কমেছে ৪৯ শতাংশ কোম্পানির

আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা
আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ১০: ১৬
মুনাফা কমেছে ৪৯ শতাংশ কোম্পানির

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই স্পষ্ট হয়েছে, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমেছে, আর তার চাপ পড়েছে দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায়।

জুলাই-সেপ্টেম্বর মেয়াদে সোমবার পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১১০টি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ তাদের ব্যবসায় আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ৫৪টির অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকের শেয়ারপ্রতি মুনাফা বা ইপিএস কমেছে। এই সংখ্যা নিজেই বলে দেয়, বাজারে চাহিদা কম, ব্যয় বেশি, আর মুনাফার জায়গাটা সংকুচিত।

তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ইপিএস বেড়েছে আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা ৪৬.৩৬ শতাংশ বা ৫১টি কোম্পানিতে, আর আয়-ব্যয় অপরিবর্তিত রয়েছে ৫টির। কিন্তু সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, ইপিএস বাড়া বা কমার পরও ৩১টি কোম্পানি বা ২৮.১৮ শতাংশ এখনো লোকসানে। অর্থাৎ ব্যবসার খরচ বেড়েছে, বিক্রি চাপে, আর মুনাফায় ফেরার পথ এখনো কঠিন। প্রান্তিকের এই হিসাব দেখাচ্ছে, করপোরেট খাত চাপে আছে, আর সেই চাপ সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছে পুঁজিবাজারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণ ও কর খাতে চাপ বৃদ্ধিই অধিকাংশ কোম্পানির মুনাফা কমার প্রধান কারণ।

পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, বেশির ভাগ কোম্পানির ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ভালো নয়। পরিচালন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কর এবং আর্থিক ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। ফলে কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা মার্জিন সংকুচিত হয়েছে।

সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন আরও বলেন, সার্বিকভাবে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে ভাড়া ও ডলারের দামের কারণে ব্যয় বেড়েছে। প্রযুক্তি খাতে সেবা মূল্য বা চার্জও বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংকের সুদের হারও বেশি। যারা ঋণনির্ভর ব্যবসা করছে, তাদের সুদের পেছনে ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারায় লাভ কমেছে।

জেএমআই হসপিটালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেবা ও পণ্য বিক্রি কমে গেছে। অথচ সেই অনুযায়ী কমেনি পরিচালন ব্যয়।

লোকসান আরও বেড়েছে যেসব কোম্পানির

মোট ১৩টি লোকসানি কোম্পানির লোকসান আরও বেড়েছে, আর এই বৃদ্ধিটা এতটাই তীব্র যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা সরাসরি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ স্তরে ঠেকেছে—এমনটাই বোঝা যাচ্ছে তাদের ইপিএস থেকে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এসকোয়ার নিটে। আগে তাদের ইপিএস ছিল ঋণাত্মক ৭ পয়সা, এখন সেটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১ টাকা ১০ পয়সায়। অর্থাৎ লোকসান এক লাফে বেড়েছে ১,৪৭১ শতাংশ; যা কোনো কোম্পানির জন্যই খুব কঠিন পরিস্থিতি।

মেঘনা সিমেন্টের অবস্থা আরও ভারী। লোকসান বেড়ে ৫৪৪ শতাংশ, আর ইপিএস নেমে গেছে ঋণাত্মক ২১ টাকা ১৯ পয়সায়; যা টাকার পরিমাণে পুরো তালিকার মধ্যে সবচেয়ে বড় লোকসান। বিবিএস কেব্‌লস ও বসুন্ধরা পেপার মিলের পরিস্থিতিও খারাপ। বিবিএস কেব্‌লসের লোকসান বেড়েছে ৩৩০ শতাংশ, আর বসুন্ধরা পেপারের ২৬৬ শতাংশ। এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিও লোকসানের চাপে আছে; তাদের ক্ষতি বেড়েছে প্রায় ১০৩ শতাংশ।

লোকসান কিছুটা কমেছে

৭টি লোকসানি কোম্পানির ক্ষতি কিছুটা কমেছে। সাফকো স্পিনিং, জিকিউ বলপেন, অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজ, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, সি পার্ল, ডেলটা স্পিনার্স ও পেনিনসুলা চিটাগংয়ের লোকসান কমলেও তারা এখনো নিট মুনাফায় ফেরেনি।

যাদের মুনাফা বেড়েছে

৫১টি কোম্পানি গত বছরের চেয়ে বেশি মুনাফা করেছে। সবচেয়ে বড় লাফ এভিন্স টেক্সটাইল—ইপিএস ১ পয়সা থেকে ১১ পয়সা, প্রবৃদ্ধি ১,০০০ শতাংশ। বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লোকসান কাটিয়ে ৬৬ পয়সা মুনাফায় ফিরেছে, প্রবৃদ্ধি ৬০৭ শতাংশ। খুলনা পাওয়ারের ইপিএস বেড়েছে ৫২৫ শতাংশ, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার ৫০০ শতাংশ, রহিম টেক্সটাইল ৪৮২ শতাংশ—সবাই আগের বছরের তুলনায় শক্ত উন্নতি দেখিয়েছে।

যাদের মুনাফা কমেছে

৫৪টি কোম্পানির মুনাফা কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে বিডি থাই ফুড। আগের বছর ৩ পয়সা লাভ করলেও এবার উল্টো গিয়ে ৪৯ পয়সা লোকসান দেখিয়েছে; লোকসান বেড়েছে ১,৭৩৩ শতাংশ। ন্যাশনাল টিউবসও বড় ধাক্কা খেয়েছে, লোকসান বেড়েছে ৭৪১ শতাংশ।

মেঘনা সিমেন্ট শতাংশের হিসাবে তৃতীয় অবস্থায় থাকলেও টাকার হিসাবে আঘাতটা সবচেয়ে বেশি; তাদের ইপিএস কমেছে পুরো ২৪ টাকা ৪৮ পয়সা। শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মুনাফা কমেছে ৪৩৫ শতাংশ এবং ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের ৩৩৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে এসব কোম্পানির আয় গত বছরের তুলনায় স্পষ্টভাবে নেমে গেছে।

আস্থা ফেরাতে যা জরুরি

বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। ট্রেজার সিকিউরিটিজের শীর্ষ কর্মকর্তা মোস্তফা মাহবুব উল্লাহ বলেন, খরচ নিয়ন্ত্রণে কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। পাশাপাশি মুদ্রার স্থিতিশীলতা ও সুদের হার কিছুটা কমালে ব্যবসার পরিবেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের চাপ অব্যাহত থাকলে আগামী প্রান্তিকেও একই চিত্র থাকতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বছরের পর বছর দলবদ্ধ ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেল, বিচার না পেয়ে দুই বোনের আত্মহত্যা

ইরানের নতুন রণকৌশল: হরমুজের তলদেশ নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান

বিনা খরচে কারিনা কায়সারের মরদেহ দেশে আনছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস

জেরুজালেমের কাছে বিশাল বিস্ফোরণ, ইসরায়েল বলছে ‘পূর্বপরিকল্পিত পরীক্ষা’

রাজধানীতে ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি, অলিগলিতে জলাবদ্ধতা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত