Ajker Patrika

বাজারে নৈরাজ্য: এলপিজির সংকট নিরসনে সরকারের পাঁচ পদক্ষেপ

  • ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ধর্মঘট প্রত্যাহার
  • ভ্যাট হ্রাস এবং আমদানি ও ঋণপ্রক্রিয়া সহজ হবে
  • বাজার স্বাভাবিক হতে পারে দু-এক সপ্তাহের মধ্যে
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮: ৪২
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ডাকা ধর্মঘটের কারণে বন্ধ রাখা হয় সিলিন্ডারের দোকান। গতকাল রাজশাহী নগরের বিন্দুর মোড় এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ডাকা ধর্মঘটের কারণে বন্ধ রাখা হয় সিলিন্ডারের দোকান। গতকাল রাজশাহী নগরের বিন্দুর মোড় এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘সরবরাহ সংকটের’ কারণে এমনিতেই নৈরাজ্য চলছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে। এর মধ্যে এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ডাকা ধর্মঘটের কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের চরম সংকট দেখা দেয়। এ সুযোগে মজুত করা সিলিন্ডার ইচ্ছামতো দামে বিক্রি করেন কিছু খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল এলপিজি সমস্যার নিরসনে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো ও ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়াসহ পাঁচ ধরনের পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে সরকার। পাশাপাশি সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর গতকাল বিকেলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন এলপি গ্যাস ব‍্যবসায়ীরা। তবে এসব পদক্ষেপের পরও বাজার স্বাভাবিক হতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লেগে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলপি গ্যাস ব‍্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নেতারা গতকাল বিকেলে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অংশ নেন। এই বৈঠকের পরই সারা দেশে এলপিজি বিপণন ও সরবরাহ কাজে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

বৈঠকে নেতারা তিনটি দাবি উত্থাপন করেন—সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি করা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।

সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য বাজারের অরাজকতা বন্ধে সরকারি কর্তৃপক্ষ অভিযান চালাচ্ছিল। গত মঙ্গলবার জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান অভিযোগ করেন, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণেই এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

এলপি গ্যাস ব‍্যবসায়ী নেতা সেলিম খান দাবি করেন, অপারেটরদের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনতেই তাঁদের ১ হাজার ৩০০ টাকার বেশি দিতে হয়। তাই ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকার কমে বিক্রি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।

বৈঠকে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, চলমান অভিযানের বিষয়ে তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন এবং চার্জ বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন।

নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াব জানিয়েছে, জাহাজ সংকটের মধ্যেও পণ্যটি আমদানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহের সংকট কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। তবে বাড়তি দামের বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, জানুয়ারি মাসের জন্য সরকারনির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির কোনো যুক্তি তিনি দেখছেন না।

সরকারের নেওয়া ৫ পদক্ষেপ

বাজারে চলমান সংকট নিরসনে সবুজ জ্বালানি বিবেচনায় এলপিজিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে আরোপিত ভ্যাট কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুরোধ জানিয়ে গতকাল চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং উৎপাদন পর্যায়ে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

ভ্যাট কমানোর সুপারিশের পাশাপাশি আমদানিকারকদের জন্য ব্যাংকঋণ গ্রহণ ও এলসি (ঋণপত্র) খোলার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এ ছাড়া জ্বালানি বিভাগ থেকে আরও তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো আমদানির সিলিং বৃদ্ধির (অতিরিক্ত আমদানি) জন্য ওমেরা, মেঘনা, যমুনা, ইউনাইটেড আই গ্যাস ও ডেল্টা—এই পাঁচ কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া আবেদনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি দিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে বিইআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে মন্ত্রিসভা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া অপারেটরদের আমদানি করা এলপিজির মজুতের প্রকৃত চিত্র জানতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরসংলগ্ন স্টোরেজ পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই সরকারকে আমদানি বাড়াতে বলছিলাম। সে অনুসারে অনুমোদনও চাওয়া হয়েছে। তখন পদক্ষেপ নিলে এখন হয়তো বাজারের এমন পরিস্থিতি হতো না। তবে আমদানি বাড়াতে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এলপিজির সরবরাহ বাড়বে।’

গতকালের বাজার: নৈরাজ্য তুঙ্গে

ধর্মঘট ডাকার কারণে সরকারনির্ধারিত ১ হাজার ৩০০ টাকার গ্যাস সিলিন্ডার কোথাও কোথাও ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে গতকাল। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এলপিজির অনেক খুচরা দোকান বন্ধ রয়েছে। কিছু দোকান খোলা থাকলেও সিলিন্ডার নেই বলে জানান কর্মীরা। কিছু দোকানে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা দামে।

জানতে চাইলে রাজধানীর মুগদাপাড়া এলাকার মান্ডা প্রথম গলির মোড়ের দোকানের সিলিন্ডার বিক্রেতা মো. রাকিব বলেন, ‘প্রতিবছরই শীত এলে কিছুটা দাম বাড়ে। তবে এ বছর অস্বাভাবিক বেড়েছে। এখন গ্যাস পাওয়াই যাচ্ছে না। খুব পরিচিত কাস্টমার যাঁরা, তাঁদেরকে বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তবে দাম বেশি লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ সমস্যা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলতে পারে বলে ডিলাররা আমাদের ধারণা দিয়েছেন। মনে হচ্ছে, এখন প্রশাসন খুব বেশি কার্যকর নয়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা যে যেমন পারছেন দাম রাখছেন।’

সরবরাহ সংকটের কথা বলে এক মাস ধরেই অনেক বেশি দাম রাখছেন খুচরা বিক্রেতারা। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের খুচরা দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ২৫৩ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা করে বিইআরসি। কিন্তু ব্যবসায়ী সমিতি চাইছে সরকারনির্ধারিত এ দামের চেয়ে ২০০ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করতে। তাঁরা বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলোর অভিযান বন্ধ করারও দাবি তুলেছে। সরকার দাম বাড়ানোর পরও বাজারে স্বস্তি না আসায় ‘কারসাজি’ বন্ধ করতে অভিযান জোরদার করে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি)। এর জেরে গত বুধবার সন্ধ্যায় পরদিন (গতকাল) থেকে গ্যাস বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয় এলপিজি ব‍্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত