Ajker Patrika

ঋণের চাকা আবার ঘুরছে

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
ঋণের চাকা আবার ঘুরছে
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

দীর্ঘদিন প্রায় থমকে থাকা বেসরকারি খাতের ঋণের চাকা আবার ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করেছে। টানা কয়েক মাসের নিম্নমুখী প্রবণতা পেরিয়ে শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাংকঋণ নেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। প্রবৃদ্ধির হার এখনো খুব বেশি নয়, তবে নির্বাচনের পর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমে আস্থা ফিরতে শুরু করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে এখনই শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এপ্রিলে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, আর মার্চে নেমে এসেছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা ছিল প্রায় ২২ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ মার্চে তলানিতে পৌঁছানোর পর টানা দুই মাস ঋণ প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মে শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ, আর সেই বিনিয়োগের প্রধান অর্থায়নের উৎস ব্যাংকঋণ। ফলে এ খাতে ঋণপ্রবাহের পরিবর্তনকে উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, কয়েক মাস ধরে ঋণপ্রবাহে যে পরিবর্তনের আভাস মিলছে, তা দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ বাড়লেও তার বড় অংশ নতুন শিল্প বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নয়; ব্যবসা সচল রাখতে চলতি মূলধনের চাহিদা মেটাতেই নেওয়া হচ্ছে। কাঁচামাল কেনা, উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ও পরিচালন ব্যয়েই এ ঋণের ব্যবহার বেশি। তবে এটিকে ইতিবাচক বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হলে নতুন বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এ জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

গত দুই-তিন বছরে বৈশ্বিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের চাপ, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসা-বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়। উদ্যোক্তারা নতুন শিল্পে না গিয়ে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখায় মনোযোগ দেন। তারল্যসংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও সতর্ক ঋণনীতিও ঋণপ্রবাহ সীমিত রাখে।

ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখন রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন ক্রয়াদেশ ও ঋণের চাহিদা বাড়ছে। চলতি মূলধনের পাশাপাশি মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের আবেদনও বাড়ছে, বিশেষ করে এসএমই, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ ও আইটি খাতে। তবে ব্যাংকগুলো এখনো আর্থিকভাবে সক্ষম উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদেরই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত কয়েক বছরে নানা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটে ঋণের চাহিদা কমে গিয়েছিল। তবে নির্বাচনের পর থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের আগ্রহও বাড়ছে। অধিকাংশ ব্যাংক ঋণ দিতে প্রস্তুত থাকলেও আগের তুলনায় যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করা হয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রেখেও ঋণের সুদহার স্প্রেড কমানো, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, ঋণ পুনঃ তফসিলে ডাউন পেমেন্ট ১ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও জানুয়ারি-জুন মুদ্রানীতিতে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল, মে পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এ বাস্তবতায় আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত