Ajker Patrika

পিআরআইয়ের সেমিনার: মার্চেই ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছে সরকার

  • দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩% প্রবৃদ্ধি করোনার পর সর্বনিম্ন।
  • সংস্কার থেকে সরে আসা হলে তা আত্মঘাতী হবে।
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
পিআরআইয়ের সেমিনার: মার্চেই ২০ হাজার কোটি
টাকা ছাপিয়েছে সরকার
‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস: বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক গতকালের অনুষ্ঠানে অতিথিরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

সরকারের অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে আয়ের গতি স্পষ্টতই মন্থর, আর সেই চাপ সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বলছে, এই পরিস্থিতিতে সরকার কার্যত নতুন টাকা ছাপিয়ে ব্যয় মেটানো শুরু করেছে।

সংস্থাটির মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসেই সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা মূলত নতুন সৃষ্ট অর্থ। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের অর্থায়ন অব্যাহত থাকলে খুব দ্রুতই এর প্রভাব বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে ফেব্রুয়ারি ও মার্চের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস: বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজনে অস্ট্রেলিয়ার ডিএফএটি যুক্ত ছিল।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত গত দেড় বছরে অর্থনীতি একধরনের ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের ভেতর দিয়ে গেছে, যার ভিত্তি এখনো দুর্বল। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ শতাংশে, যা মহামারির পর সর্বনিম্ন। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা একসঙ্গে অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহের দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন মিলিয়ে এই চাপ আরও তীব্র হচ্ছে। রপ্তানি আয় কমে যাওয়া ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বহির্বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, আর সীমিত নীতিগত সক্ষমতা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে সংস্কার থমকে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

আশিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, সংস্কার থেকে সরে আসা হলে তা আত্মঘাতী হবে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি নিয়েও অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, ফলে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় এখন জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার বলেন, হরমুজ ইস্যুসহ বৈশ্বিক অস্থিরতা জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দামে প্রভাব ফেলছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে, যদিও বর্তমান বাস্তবতায় ২০২৬ অর্থবছরে ৪.৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিই যুক্তিসংগত।

সমাপনী আলোচনায় পিআরআইর গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল না হওয়ার কারণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ জরুরি, পাশাপাশি ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে বন্ড বাজার শক্তিশালী করা দরকার।

প্যানেলে আলোচনায় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ অধিকাংশ চ্যালেঞ্জকে ‘আত্মসৃষ্ট’ বলে মন্তব্য করেন, আর অন্য বক্তারা আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অতিরিক্ত অর্থ সৃষ্টির ঝুঁকি এড়ানোর ওপর জোর দেন।

এ ছাড়া শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়াতে জাহাজ নির্মাণশিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরে নীতিগত সহায়তা ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁদের মতে, বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে স্পষ্ট নীতিসংকেত অপরিহার্য, নইলে প্রবৃদ্ধির গতি আরও শ্লথ হয়ে পড়তে পারে এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত