ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষদিকে এবং জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত নথিটি প্রথম দর্শনে প্রথাগত দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা বলেই মনে হয়: যেখানে শুল্ক সমন্বয়, বাজার সুবিধা প্রশস্ত এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করা হয়েছে। তবে নিবিড় পর্যালোচনা করলে সেই বাহ্যিক রূপটি আর টেকে না।
চুক্তিটি গভীরভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, এটি বাণিজ্যের কোনো সংকীর্ণ বা সাধারণ সংজ্ঞার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। এতে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক বিবেচনামূলক ক্ষমতা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, মানদণ্ড কাঠামো, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স (শাসন), ক্রয় সংক্রান্ত আচরণ এবং তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে লেনদেন নিয়ে শর্ত রয়েছে। ঠিক এই কারণেই এটি বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ হওয়া উচিত।
মূল সমস্যাটি এটা নয় যে এই চুক্তি থেকে কোনো বিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া যাবে কি না। প্রধান সমস্যা হলো, পারস্পরিক বাণিজ্যের ব্যানারে বাংলাদেশকে এমন কিছু প্রভাব বিস্তারের সুযোগ এবং নীতিগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বলা হচ্ছে, যা কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের হালকাভাবে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ এগুলোর পূর্ণ মূল্য প্রায়শই কেবল সেগুলো হারানোর পরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি নথির প্রান্তে উদীয়মান কোনো গৌণ উদ্বেগ নয়। বরং, এটি চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই নিবিড়ভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে প্রায়শই দক্ষতা, উন্মুক্ততা এবং সংস্কারের মতো নিরপেক্ষ শব্দভান্ডার দিয়ে সমর্থন করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে, এ ধরনের ভাষা বিষয়টিকে স্পষ্ট করার চেয়ে বেশি আড়াল করেছে। এটি কেবল সীমান্তের বাধা কমানোর কোনো নথি নয়। এটি এমন একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি বিস্তৃত সুবিধা নিশ্চিত করছে বলে মনে হয়: যার মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক স্বীকৃতি জুড়ে অগ্রাধিকারমূলক আচরণ, বাংলাদেশের লাইসেন্সিং ক্ষমতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কৃষিতে গভীরতর প্রবেশাধিকার, ডিজিটাল এবং ডেটা-সম্পর্কিত নীতির ওপর প্রভাব, নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সহযোগিতা, এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। বিপরীতে, বাংলাদেশকেই সমন্বয়ের অনেক ভারী বোঝা বহন করতে হচ্ছে বলে মনে হয়। এটাই এই চুক্তিটিকে এত গুরুতর করে তুলেছে। এখানে যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা কেবল বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার নয়। বরং এটি কারিগরি ধারার মারপ্যাঁচে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সংকুচিত করা, যা জনদৃষ্টি আকর্ষণ না করলেও আগামী বছরগুলোতে দেশটির স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগকে পুনর্গঠন করার জন্য যথেষ্ট প্রভাবশালী।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি একই সঙ্গে সবচেয়ে সহজও বটে: এখানে ঠিক কী অর্জন করা হচ্ছে যা এত বিশাল বিসর্জনকে ন্যায়সংগত করে? কারণ, চুক্তির কাঠামোটি উপেক্ষা করা কঠিন। বাংলাদেশকে একটি অস্বাভাবিক বিস্তৃত ডোমেইন জুড়ে উদারীকরণ, স্বীকৃতি, সমন্বয়, সংযম এবং খাপ খাইয়ে নিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক সংকীর্ণ ছাড় দিচ্ছে, অনেক বেশি ব্যাখ্যামূলক সুযোগ নিজের কাছে রাখছে এবং বাংলাদেশ যদি শর্ত মেনে না চলে তবে পুনরায় শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সংরক্ষণ করছে। এটি চুক্তির ভাষার কোনো আকস্মিক বৈশিষ্ট্য নয়। বরং, এটি এর অন্যতম সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য। সেই কারণে, এই চুক্তিটিকে একটি মামুলি বাণিজ্যিক দলিল হিসেবে পড়া উচিত নয়। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি অনেকটা এমন একটি ব্যবস্থার মতো মনে হয়, যেখানে বাজার সুবিধা প্রদানের বিষয়টিকে একটি বাহন হিসেবে ব্যবহার করে মূলত অসম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়াটি এমনিতেই সন্দেহের উদ্রেক করার জন্য যথেষ্ট ছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, যিনি তখন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, এই প্রক্রিয়াটি তড়িঘড়ি করে করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল যে এটি ‘অন্ধকারে’ করা হয়নি এবং চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে বিএনপি ও জামায়াত এতে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু যদি তা-ই হয়, তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব মোটেও আশ্বস্ত করার মতো নয়। এটি নির্দেশ করে যে, যখন একটি গভীর কৌশলগত চুক্তির ক্ষেত্রে জনগণকে অর্থবহ স্বচ্ছতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, তখন জনচক্ষুর অন্তরালে অভিজাত কুশীলবদের মধ্যে সম্মতির পথগুলো হয়তো আগেই নিশ্চিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে একে এমনভাবে সমর্থন করা হয়েছে যেন গোপনীয়তাই বৈধতার বিকল্প।
চুক্তির অভ্যন্তরীণ যুক্তিগুলো ধারা অনুযায়ী অনুসরণ করলে সেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। এর প্রয়োগ সংক্রান্ত বিধানগুলোতে এই ভারসাম্যহীনতা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। অনুচ্ছেদ ৬.৪ স্পষ্ট করে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তি পরিপালন করছে না, তবে তারা আলোচনার আহ্বান জানাতে পারে এবং সন্তোষজনক ফলাফল না পেলে নির্দিষ্ট বা সমস্ত বাংলাদেশি আমদানির ওপর পুনরায় শুল্ক আরোপ করতে পারে। একই বিধানে জোর দেওয়া হয়েছে যে, চুক্তির কোনো কিছুই কোনো পক্ষকে অনুচিত বাণিজ্য চর্চা, আমদানি বৃদ্ধি, অথবা নিজস্ব আইন অনুযায়ী অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলায় অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা থেকে বিরত রাখবে না। তাত্ত্বিকভাবে এই ভাষাটি দ্বিপাক্ষিক মনে হলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রই অধিকতর জবরদস্তিমূলক সক্ষমতা, বৃহত্তর বাজার ক্ষমতা এবং বাংলাদেশের জন্য প্রতিরোধ করা কঠিন এমন শর্তে ‘অ-পালন’ সংজ্ঞায়িত করার ব্যাপক সক্ষমতা নিয়ে এই চুক্তিতে প্রবেশ করেছে। এই কারণেই প্রয়োগ সংক্রান্ত ধারাটি এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল আইনি অবলম্বন নয়, বরং এটি সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে চুক্তির ব্যাপক অসমতা রক্ষা করা হয়। বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে তারা একাধিক ক্ষেত্রে নিজেকে উদারীকরণ, সমন্বয় এবং সীমাবদ্ধ করবে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন যখনই মনে করবে যে সেই ছাড়গুলো অপর্যাপ্তভাবে পালিত হচ্ছে, তখনই চাপ প্রয়োগের অধিকার নিজের হাতে রাখবে।
যদি নথিটি কেবল এই ধরনের বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তবে তা এমনিতেই উদ্বেগের কারণ হতো। কিন্তু এই চুক্তিটি সেখানেই থেমে থাকেনি। এটি বারবার এমন এক ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে যা চরিত্রের দিক থেকে অনেক বেশি কৌশলগত; যেখানে বিষয়টি আর কেবল বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পছন্দসমূহকে ক্রমশ নির্দিষ্ট শর্তাধীন করে তোলার নামান্তর। এর অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ অনুচ্ছেদ ৪.১। এতে বলা হয়েছে যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক বা জাতীয় সুরক্ষা রক্ষার জন্য প্রাসঙ্গিক মনে করে এমন কোনো সীমান্ত ব্যবস্থা বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে আলোচনার পর বাংলাদেশকেও সেই মার্কিন পদক্ষেপের সমর্থনে একটি পরিপূরক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা গ্রহণ বা বজায় রাখতে হবে। এই ধারার গুরুত্ব কোনোভাবেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। এটি কেবল ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা মেনে চলতে বলছে না, বরং এটি বাংলাদেশকে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় গৃহীত নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে, এমনকি তৃতীয় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধেও, নিজেকে সারিবদ্ধ করতে বলছে। মূল বিষয়বস্তুর দিক থেকে, বাংলাদেশকে মার্কিন কৌশলগত বাণিজ্যিক অবস্থানের উপাদানগুলোকে সমর্থন করার বাধ্যবাধকতায় টেনে আনা হচ্ছে; এটা এ জন্য নয় যে বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা এটি দাবি করে, বরং এ জন্য যে যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করেছে যে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য এটি প্রয়োজন।
অনুচ্ছেদ ৪.২ সেই যুক্তিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা-সংবেদনশীল প্রযুক্তি এবং পণ্যগুলো বিদ্যমান রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অধীনে নিয়ন্ত্রণ করা, মার্কিন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে নিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে সমন্বয় করা এবং বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো যাতে সেই নিয়ন্ত্রণগুলোকে ‘পূরণ বা অবমূল্যায়ন’ না করে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে সহযোগিতা করবে যাতে সেই সব লেনদেনকে সীমাবদ্ধ করা যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত হলে বা কোনো মার্কিন নাগরিক দ্বারা সম্পাদিত হলে তাদের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিধি লঙ্ঘন করত। এখানে চুক্তিটি কেবল হস্তক্ষেপমূলক হওয়ার গণ্ডি পেরিয়ে প্রকাশ্য শাস্তিমূলক রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশকে কেবল তার নিজস্ব আইন বা তার সম্মতি দেওয়া বহুপাক্ষিক নিয়ম মেনে চলতে বলা হচ্ছে না। বরং তাকে এমন একটি নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে আত্মস্থ করতে এবং তার সমর্থনে কাজ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যার মূল মানদণ্ড হলো ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিচারবুদ্ধি। একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য এটি কোনো কারিগরি ছাড় নয়। এটি তার ভূ-রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করা, বিশেষ করে এমন একটি সময়ে যখন দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি আমদানির ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। এটি এই সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় যে, ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে কেবল বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের নিরিখে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সহনশীলতার মাপকাঠিতেও যাচাই করতে হবে।
একই ধরনের প্যাটার্ন বা ধরন লক্ষ্য করা যায় অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পৃক্ততা সংক্রান্ত চুক্তির ধারাগুলোয়। অনুচ্ছেদ ৩.২ অনুযায়ী, যদি বাংলাদেশ এমন কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে যা যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য স্বার্থকে বিপন্ন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিটি বাতিল করতে পারে এবং পুনরায় আগের মতো শুল্ক আরোপ করতে পারে। অনুচ্ছেদ ৪.৩ ব্যাপকতর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই একই যুক্তির প্রতিফলন ঘটায়, যা ওয়াশিংটনকে এই চুক্তিটি বাতিল করার অনুমতি দেয় যদি বাংলাদেশ পরবর্তীতে কোনো ‘নন-মার্কেট দেশ’ বা ‘অ-বাজার রাষ্ট্রের’ সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যা বর্তমান ব্যবস্থাকে ক্ষুণ্ন করে। এগুলো অত্যন্ত অস্বাভাবিক বিধান—এ জন্য নয় যে শক্তিশালী দেশগুলো প্রভাব বিস্তার করতে চায় না, বরং এ জন্য যে এখানে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি একটি বাণিজ্যিক দলিলে বিধিবদ্ধ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা গ্রহণ করছে না, বরং এমন সব ধারা মেনে নিচ্ছে যা তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার ভবিষ্যতের কূটনীতিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করবে। প্রতিদ্বন্দ্বী বাহ্যিক চাপের সন্ধিস্থলে অবস্থিত একটি দেশের জন্য এই ধরনের ধারাগুলো গৌণ বিষয় নয়। এগুলো কৌশলগত নমনীয়তার মূলে আঘাত করে। ছোট রাষ্ট্রগুলো তাদের বিকল্প নির্বাচনের সুযোগ বজায় রাখার মাধ্যমেই ভারসাম্য রক্ষা করে। এই চুক্তিটি স্পষ্টতই একাধিক পয়েন্টে সেই সুযোগ আগেভাগেই কমিয়ে দেওয়ার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে বলে মনে হয়।
সম্ভবত কৌশলগত অতি-অতিক্রমের বিষয়টি অনুচ্ছেদ ৪.৩ (৫)-এর চেয়ে অন্য কোথাও এত নগ্নভাবে প্রকাশ পায়নি; যেখানে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয় করবে না যা যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য স্বার্থকে বিপন্ন করে—কেবল বিদ্যমান স্বত্বাধিকারী উপকরণ বা পূর্ববর্তী চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত সংকীর্ণ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এখানে যা কিছু স্বাভাবিকীকরণ করা হচ্ছে তার গুরুত্ব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত একটি নথিকে ব্যবহার করে কোনো রাষ্ট্রের অন্যতম কৌশলগত খাত—দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অবকাঠামো—সংক্রান্ত সার্বভৌম ক্রয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। এখানে কার্যকর মানদণ্ড এটি নয় যে কোনো সরবরাহকারী বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে কি না, কিংবা সেই পছন্দটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার অধীনে বৈধ কি না; বরং মানদণ্ডটি হলো সেই সরবরাহকারী ‘যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য স্বার্থকে’ বিপন্ন করছে কি না। একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তিতে এই ধরনের মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা বিস্ময়কর। এটি এই চুক্তির ভাষার অন্তর্নিহিত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অস্বাভাবিক স্পষ্টতার সঙ্গে উন্মোচিত করে: কেবল আদান-প্রদান সহজতর করা নয়, বরং মার্কিন কৌশলগত পছন্দগুলোকে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কাঠামোর মধ্যে গেঁথে দেওয়া।
এই চুক্তিটিকে আসলে যা, ঠিক সেভাবেই বোঝা উচিত: এটি কোনো রুটিনমাফিক বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগতভাবে অসম দলিল যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সীমিত এবং শর্তসাপেক্ষ কিছু সুবিধার বিনিময়ে তার প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা বা ‘লেভারেজ’ বিসর্জন দিতে বলা হচ্ছে। আসল প্রশ্নটি কেবল এটি নয় যে বাংলাদেশ স্বল্প মেয়াদে কী লাভ করতে পারে, বরং প্রশ্নটি হলো দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি কী কী বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। সেখানেই প্রকৃত খেসারত নিহিত।
আর যেহেতু সেই খেসারত অত্যন্ত গুরুতর, তাই দায়বদ্ধতা কেবল এই নথির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যারা এর মধ্যস্থতা করেছে, একে সক্ষম করেছে, বন্ধ দরজার আড়ালে এতে সম্মতি দিয়েছে, অথবা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত নাজুক মুহূর্তে একে পাস করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশিদের যদি এমন একটি চুক্তির পরিণতি ভোগ করতে বলা হয়, তাহলে তারা এটি জানারও অধিকার রাখে যে ঠিক কারা তাদের নামে এত কিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল।
লেখক: ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক লেখক এবং একটি চীনা থিংক ট্যাংকের গবেষক

আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েল কি তার পুরোনো বন্ধু হারাল? একসময় যে ইসরায়েলকে আমেরিকানরা ‘ডেভিড’ (অল্প শক্তির বীর) এবং আরব বিশ্বকে ‘গোলিয়াথ’ (বিশাল শক্তিশালী শত্রু) হিসেবে দেখত, সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক আমেরিকার বড় একটি অংশ এখন ইসরায়েলকে দেখে কেবল এক আগ্রাসী সামরিক শক্তি হিসেবে।
৯ ঘণ্টা আগে
ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার দিনটি শুরু হয়েছিল ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনার জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ইসলামাবাদে নিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল এয়ার ফোর্স–টু।
১২ ঘণ্টা আগে
ছয় সপ্তাহ ধরে চলা ইরানের ওপর আরোপিত ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবের সংযম অনেককে বিস্মিত করেছে। শুরুর পরপরই যুদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দেশগুলোর অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পাল্টা অবরোধ কয়েক দশক ধরে চলা নিরাপত্তা
১ দিন আগে
গত সপ্তাহে যখন ইরানে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি চুক্তির সম্ভাবনা ঘনিয়ে আসছিল ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কিছু করলেন, যা তাঁর সহযোগীরা বারবার না করার অনুরোধ করেছেন। তিনি যেন গণমাধ্যমের ভায়া হয়েই ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইলেন।
১ দিন আগে