Ajker Patrika

সরকারি ঋণের ৫৭ শতাংশ এখনো ব্যাংকব্যবস্থা নির্ভর

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
সরকারি ঋণের ৫৭ শতাংশ এখনো ব্যাংকব্যবস্থা নির্ভর
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

দেশের সরকারি ঋণকাঠামোতে বৈদেশিক ঋণের প্রতি ঝোঁক ধীরে ধীরে বাড়লেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জুড়ে রয়েছে দেশীয় উৎস। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট সরকারি ঋণের ৫৭ শতাংশই ছিল অভ্যন্তরীণ, যেখানে বৈদেশিক ঋণের অংশ ৪৩ শতাংশে সীমিত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক বুলেটিনে উঠে এসেছে এই চিত্র।

এই কাঠামোর পেছনে রয়েছে সরকারের কৌশলগত পদক্ষেপ এবং বৈদেশিক ঋণের উৎসে তৈরি হওয়া বাস্তবতা—দুটি বিষয়ই একসঙ্গে কাজ করছে। বিভিন্ন কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা আগে অনুমোদিত ঋণ ছাড়ে ধীরগতি দেখাচ্ছে, নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতিও কম দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিদেশি ঋণ পরিশোধে ডলারের ওপর চাপ ও নির্ভরতা—দুটিই বাড়ে, ফলে বিনিময় হারের ঝুঁকিও তীব্র হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকার এই চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। সব মিলিয়ে, পরিকল্পিতভাবেই ঋণ ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রধান ভরসা এখনো দেশীয় উৎসের ওপরই রয়ে গেছে।

সংখ্যার দিকে তাকালে এই প্রবণতা আরও পরিষ্কার হয়। ২০২৪ সালের জুন শেষে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে, দেশি-বিদেশি মোট সরকারি ঋণ ছিল ১৮ লাখ ১০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে, ডিসেম্বর শেষে সেই অঙ্ক ছাড়িয়ে যায় ২২ লাখ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এই সময়েই দুই লাখ ৬২ হাজার ২৯১ কোটি টাকার নতুন ঋণ যুক্ত হয়েছে সামগ্রিক হিসাবের সঙ্গে।

ঋণের এই সম্প্রসারণে অভ্যন্তরীণ উৎসের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা ওই বছর ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায়। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণও বেড়েছে, তবে তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম গতিতে। ওই সময় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে তা হয়েছে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায়।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের চিত্র এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার মোট ৬২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু এই বৃদ্ধির পুরো চাপটাই প্রায় বহন করেছে অভ্যন্তরীণ উৎস। এ সময়ে বৈদেশিক ঋণ কমেছে ৫৯ শতাংশ, নেমে এসেছে ১০ হাজার ১৩০ কোটি টাকায়। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ৭০ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়।

এই অভ্যন্তরীণ ঋণের একটি বড় অংশ এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজ বা ঋণপত্রের মাধ্যমে। পাশাপাশি ১৯ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা সরাসরি নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, এই ধারার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রতি স্পষ্ট ঝোঁক রয়েছে, যা ঋণ ব্যবস্থাপনাকে কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সুদ পরিশোধের চাপও। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে মোট সুদ পরিশোধ বেড়ে ৭১ হাজার ২৫৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শুধু অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদই ৬১ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, যেখানে প্রবৃদ্ধি ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ উৎসে নির্ভরতা বাড়ার একটি সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্ব ব্যয়ের ওপর।

অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা অর্থনীতিতে নতুন নয়। তবে মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। তাদের মতে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে, সরকারি সিকিউরিটিজে মুনাফার হার কমছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এই মুহূর্তে সরকারি ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতকে তেমনভাবে চাপে ফেলছে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত