Ajker Patrika

রাজধানীর বাজারদর: করছাড়ের প্রভাব নেই বাজারে

  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের দাম বেড়েছে
  • কর কমলেও তার সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না
  • মাছের দাম কমাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে: বিক্রেতা
  • এই কর কমানোটা বিশাল সমুদ্রের মধ্যে এক চামচ পানি দেওয়ার মতো: বিশেষজ্ঞ
আবুল বাসার সাজ্জাদ, ঢাকা
রাজধানীর বাজারদর: করছাড়ের প্রভাব 
নেই বাজারে

নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে কর কমানোর সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার এক মাসেও বাজারে তার প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। চাল, পেঁয়াজ-রসুন, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেলসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম আগের মতোই রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার দাম বেড়েছেও। ফলে সরকারের কর ছাড়ের সুফল পাচ্ছে না ভোক্তারা। সাংসারিক ব্যয়ের চাপ কমছে না সীমিত আয়ের মানুষের ওপর থেকে।

গত ১১ জুন ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেট সরকার মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ও কর কমানো বা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে উৎসে করের হার ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

বুধ ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার ঘুরে দেখা যায়, কর ছাড়ের ঘোষণার পর এতদিনেও অধিকাংশ পণ্যের খুচরা দামে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ব্যবসায়ীরা যথারীতি বলছেন, আগে বেশি শুল্কে আমদানি করা পণ্য এখনো বাজারে থাকায় নতুন করহারের প্রভাব পুরোপুরি পড়তে সময় লাগবে। অন্যদিকে ভোক্তাদের অভিযোগ, কর কমলেও তার সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না।

বাজেট প্রস্তাবে খাদ্যসহ যেসব নিত্যপণ্যের ওপর থেকে কর হ্রাসের কথা বলা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল ধান, চাল, গম, আটা, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ বিভিন্ন কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এসব পণ্যের ওপর থেকে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সরকারের আশা ছিল, এসব পণ্যের আমদানি ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে করের চাপ কমায় খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়বে।

আলু, মুরগি ও মাছের দাম বাড়তি

সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির তথ্য অনুযায়ীই, গত এক মাসে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে অন্তত ২০ টাকা বেড়েছে। আগে ১৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৮০ টাকা। বাজেট ঘোষণার আগে প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। বর্তমানে তা প্রায় ৩০ টাকা।

মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা নাজির আহমেদ জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরেই তিনি ৩০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন। তবে তার আগে অনেকদিন ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করেছেন।

বগুড়ার শেরপুর থেকে ঢাকায় আলু সরবরাহকারী মশিউর রহমান বলেন, কম দাম পেয়ে কৃষকেরা আলু বাজারে ছাড়ছেন না। পাশাপাশি সেখানে আন্দোলনও চলছে। এই সুযোগে ঢাকার বাজারে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন।

কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা আদিলুর রহমান বলেন, ‘বাজেটের পর অন্তত নিত্যপণ্যের দাম কিছু কমবে বলে আশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে আলু ও বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম বেড়েছে।’

চালের বাজারেও স্বস্তি নেই

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের বিসমিল্লাহ রাইস এজেন্সির কর্মী মো. তরুণ আহমেদ জানান, গত কয়েক দিনে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা এবং নাজিরশাইল ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। চিনিগুঁড়া চালের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চোকদার বলেন, স্থানীয় বাজারে গত সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম প্রায় ১ টাকা কমেছে। তবে এটি ভালো উৎপাদনের কারণে নাকি কর ছাড়ের প্রভাবে হয়েছে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

টাউন হল বাজারে আসা কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘কয়েক মাস আগেও এক কেজি চিনিগুঁড়া চাল পেতাম ১৫০ টাকায়। এখন ১৮০ টাকা। আর কবে দাম কমবে!’

মসলা, তেল ও নিত্যপণ্যে নেই পরিবর্তন

বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রায় ৪০ টাকা। রসুন ও আদা মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৭০ টাকায়। বোতলের ভোজ্যতেলের দামও অপরিবর্তিত থেকে লিটারপ্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যদিও বোতলের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৯৯ টাকা লেখা।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের নিউ হক ভ্যারাইটিজ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. শরীফ বলেন, ‘কোনো কোম্পানি এখনো তেলের দাম কমানোর বিষয়ে কিছু জানায়নি। কোম্পানির প্রতিনিধিরা চাহিদার তথ্য নিচ্ছেন, কিন্তু দাম কমার কোনো ঘোষণা দেননি।’ শরীফ জানান, প্যাকেটজাত লবণ ও চিনিও আগের মতো যথাক্রমে ৪০ ও ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে, মাছের ওপর থেকেও কর কমলেও গত এক মাসে রুই মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়। তেলাপিয়া মাছের দামও প্রায় ৪০ টাকা বেড়ে কেজিপ্রতি ২৫০ টাকায় উঠেছে।

মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, ‘শুধু উৎসে কর কমালেই মাছের দাম কমবে না। মাছের উৎপাদন ব্যয়, বিশেষ করে ফিডের দাম কমাতে হবে।’

নজরদারি জোরদারের তাগিদ

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শুল্ক ও কর কমালেই সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম কমে না। কর সুবিধা আমদানিকারক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা কতটা ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, সেটিই মূল বিষয়। পাশাপাশি আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মজুতদারি এবং বাজার তদারকির ঘাটতিও দাম কমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, শুল্ক ও কর কমানোর পরও যদি বাজারে তার প্রভাব না পড়ে, তাহলে সরকারের রাজস্ব কমলেও ভোক্তারা কোনো সুবিধা পান না। তাই বাজারে কার্যকর মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, সরকার যে পরিমাণ কর কমিয়েছে, তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় খুবই সীমিত। তাঁর ভাষায়, ‘এই কর কমানোটা বিশাল সমুদ্রের মধ্যে এক চামচ পানি দেওয়ার মতো। পাঁচ হাজার টাকার বাজারে যদি ৫০ টাকা কমে, তাহলে সেটাকে কার্যকর মূল্য হ্রাস বলা যায় না।’

নিত্যপণ্যে যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর-সুবিধা মসলাজাতীয় পণ্যে। পুরান ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাজেট ঘোষণার পর পর উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, কর বেশি না কমায় দামও খুব বেশি কমার সুযোগ নেই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত