Ajker Patrika

দেশে জ্বালানির দাম এক লাফে এত টাকা আগে কখনো কি বেড়েছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
দেশে জ্বালানির দাম এক লাফে এত টাকা আগে কখনো কি বেড়েছে
ছবি: আজকের পত্রিকা

আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং বিপিসির (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) লোকসান কমানোর অজুহাতে দেশের বাজারে একলাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করেছে সরকার। নতুন এই দর ঘোষণার পর ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নতুন মূল্য সমন্বয় অনুযায়ী:

ডিজেল: ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা/লিটার (বৃদ্ধি ১৭.৪ %)

অকটেন: ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা/লিটার (বৃদ্ধি ১৩.৮ %)

পেট্রল: ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা/লিটার (বৃদ্ধি ১৪.৩ %)

কেরোসিন: ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা/লিটার (বৃদ্ধি ১৪.৮ %)

বাংলাদেশে একলাফে ২০ টাকা বা তার বেশি দাম বাড়ার ইতিহাস

বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের লাফ দেওয়ার ঘটনা মূলত তিনটি পর্যায়ে ঘটেছে। এর মধ্যে একলাফে ২০ টাকা বা তার বেশি দাম বাড়ার প্রধান ঘটনাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ২০২২ সালের ৫ আগস্ট (সর্বকালের রেকর্ড বৃদ্ধি)

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রাতে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০২২ সালের ৫ আগস্ট। সে সময় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারের সংকটের অজুহাতে:

অকটেনের দাম লিটারে ৮৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয় (লিটারে ৪৬ টাকা বৃদ্ধি)। পেট্রলের দাম ৮৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয় (লিটারে ৪৪ টাকা বৃদ্ধি)।

ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয় (লিটারে ৩৪ টাকা বৃদ্ধি)।

এটি ছিল এক ধাক্কায় ৪২ শতাংশ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত দর বৃদ্ধির এক অভূতপূর্ব রেকর্ড।

২. ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সমন্বয়

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তখন অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা (১২০ থেকে ১৪০ টাকা), পেট্রল ১৯ টাকা (১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা) এবং ডিজেলের দাম ১৫ টাকা (১০০ থেকে ১১৫ টাকা) বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

৩. ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের সমন্বয় (বর্তমান বৃদ্ধি)

সবশেষ ঘোষণায় একযোগে চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের (ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন) দামই একলাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

সরকারের যুক্তি ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই দরবৃদ্ধির মূল কারণগুলো হলো:

আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বগতি: মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও কার্গো পরিবহনের ভাড়া অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিপিসির বিশাল লোকসান: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও অভ্যন্তরীণ বাজারে দীর্ঘদিন দাম ধরে রাখায় বিপিসি গত কয়েক মাসে কয়েক হাজার কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছে।

পাচার রোধ: প্রতিবেশী দেশসমূহের (যেমন: ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড) তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম কম থাকায় সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের ঝুঁকি বাড়ছিল।

ভর্তুকির চাপ হ্রাস: ডিজেল বিক্রি করে প্রতি লিটারে বিপুল পরিমাণ লোকসান কমানোর লক্ষ্যে সরকার এই মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে জ্বালানি তেলের, বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক বহুমুখী প্রভাব ফেলে। এর ফলে বাস, ট্রাক ও নৌযানের ভাড়া সরাসরি বৃদ্ধি পায়, যা পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। সেচ মৌসুমে ডিজেলের চড়া দামের কারণে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যায়।

এক ধাক্কায় লিটারে ২০ টাকা তেলের দাম বাড়ানো দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধাপে ধাপে বা ক্ষুদ্র পরিমাণে মূল্য সমন্বয় না করে হঠাৎ একলাফে এত বড় দরবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত