Ajker Patrika

স্পেকট্রাম নীতিতে নতুন ভাবনার আহ্বান অংশীজনদের

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
স্পেকট্রাম নীতিতে নতুন ভাবনার আহ্বান অংশীজনদের
রাজধানীতে শনিবার ‘স্পেকট্রাম ফর এ কানেকটেড বাংলাদেশ: এনাব্লিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্পেকট্রাম (তরঙ্গ) বরাদ্দ নীতিতে নতুন ভাবনার আহ্বান জানিয়েছেন টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। তাদের মতে, সাশ্রয়ী মূল্যে অধিক স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। স্পেকট্রামকে শুধুমাত্র সরকারি রাজস্ব আহরণের উৎস হিসেবে দেখার পরিবর্তে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘স্পেকট্রাম ফর এ কানেকটেড বাংলাদেশ: এনাব্লিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এই সংলাপের আয়োজন করে।

মূল প্রবন্ধে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মুনির হাসান বলেন, ২০০৮ সালে স্পেকট্রাম বরাদ্দের সময় ১৮ বছরের জন্য স্পেকট্রাম দেওয়া হয়েছিল এবং তখন থেকে এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্পেকট্রাম থেকে রাজস্ব আহরণ করা। তবে গত ১৫–১৮ বছরের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, টেলিযোগাযোগ খাত দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে—যেমন সীমিত স্পেকট্রাম হোল্ডিং, অপর্যাপ্ত ফাইবার অবকাঠামো, টাওয়ার সাইটে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং স্পেকট্রামের উচ্চমূল্য। এসব সীমাবদ্ধতা শেষ পর্যন্ত সেবার মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সক্ষমতাকেও সীমিত করেছে।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। স্পেকট্রাম নবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অযৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। নেটওয়ার্কের মান, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেল, সেবার সক্ষমতা এবং গ্রাহকের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন না হয়ে বাস্তব পরিস্থিতি ও জনগণের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংলাপে অংশীজনেরা বলেন, সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্পেকট্রাম বরাদ্দের মূল্য এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উন্নত ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে স্পেকট্রামের মূল্য অর্ধেক বা তারও বেশি কমিয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত ৯০০,১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নবায়ন অনুষ্ঠিত হবে।

সংশ্লিষ্টজনেরা জানান, প্রায় দেড় দশক আগে এই ব্যান্ডগুলোর স্পেকট্রাম উচ্চ মূল্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় যদি নবায়নের সময় মূল্য হ্রাস না করা হয়, তাহলে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সেবার মান বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী এবং অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) প্রেসিডেন্ট ও রবি আজিয়াটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিয়াদ সাতারা।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, টেলিকম নীতি ও স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হবে। দাম কমিয়ে তরঙ্গ যদি বিনা মূলেও বরাদ্দ দেওয়া হয়, তখন মোবাইল অপারেটররা প্রণোদনা দেওয়ার দাবি তুলতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এমটব প্রেসিডেন্ট জিয়াদ সাতারা বলেন, স্পেকট্রামের প্রকৃত মূল্য কেবল সরকারের রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে পরিমাপ করা উচিত নয়; বরং এর মাধ্যমে যে উন্নত সংযোগ, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়, সেগুলোর ভিত্তিতেই এর মূল্যায়ন করা উচিত। স্পেকট্রামের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ অপারেটরদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের পরিবর্তে স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে ব্যয় করতে বাধ্য করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সেবার মান এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টিকে আমাদের আরও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে এবং সঠিক সমাধান ও করণীয় নির্ধারণে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের শিল্প খাতের কাঠামো ও বাস্তবতা মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

ইয়াসির আজমান আরও বলেন, গত পাঁচ বছরে জাতীয় রাজস্ব কোষাগারে আমাদের অবদান বেড়েছে, কিন্তু বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্ত রিটার্ন কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের আরও বিবেচনা করতে হবে, স্পেকট্রাম নবায়নের অর্থনৈতিক কাঠামো অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতা বজায় রাখার সুযোগ দেবে কি না।

বাংলালিংক সিইও ইয়োহান বুসে বলেন, সাশ্রয়ী স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হলে সেবার মান বৃদ্ধি পাবে, দেশের উন্নয়ন হবে ও এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

টিআরএনবির সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে আরও অংশ নেন এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার, গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম, বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান, বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিষয়ক পরামর্শক ড. খালেদ মাহমুদসহ খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত