Ajker Patrika

বিবিসির বিশ্লেষণ

সোনার বাজার অস্থির ৩ কারণে

  • যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ঘিরে অনিশ্চয়তায় সোনায় বিনিয়োগ বেড়েছে, ফলে দামও বেড়েছে।
  • গ্রিনল্যান্ড ঘিরে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ডলারের পরিবর্তে সোনার মজুত বাড়ানোর প্রবণতায় দাম বেড়েছে।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭: ৫৬
সোনার বাজার অস্থির ৩ কারণে

বছর ঘুরলেও বিশ্ববাজারে সোনার দামে অস্থিরতা থামেনি। বরং এরই মধ্যে দাম আগের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। তার প্রভাব পড়ছে দেশে দেশে, বড় ধাক্কা লেগেছে অর্থনীতিতে। বিশ্বজুড়ে দিনে দিনে যেভাবে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তাতে বিশ্লেষকেরা সঠিকভাবে বলতেও পারছেন না, ঠিক কবে নাগাদ সোনার বাজারে স্বস্তি ফিরবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তের পর সোনা, রুপা, প্লাটিনামসহ মূল্যবান ধাতবের বাজারে কিছুটা দরপতন দেখা গেছে।

এই অবস্থায় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি সোনাসহ মূল্যবান ধাতবের বাজারে অস্থিরতার পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনেও একটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে। সব কটি কারণই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদক্ষেপকেন্দ্রিক।

আন্তর্জাতিক বাজারে গত সোমবার প্রথমবারের মতো সোনার দাম আউন্সপ্রতি (৩১ দশমিক ১০৩ গ্রাম প্রায়) ৫ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে এবং অল্প সময়ের জন্য ৫ হাজার ৫০০ ডলারের ঘরে পৌঁছায়। রুপা ও প্লাটিনামের দামও বেড়েছে। বাংলাদেশের বাজারে গত বৃহস্পতিবার ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে গত শুক্র ও শনিবার দুই দফায় ভরিপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা দাম কমেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিললে এসব ধাতুর দাম দ্রুত নেমে আসে। বিশ্বের অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের বিষয়ে আগ্রহী। তবে ট্রাম্প যেসব দেশকে অনুকূল মনে করেন না, সেসব দেশের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছেন, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুক্তরাজ্যের আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেন, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, যা সোনার দামের উল্লম্ফনে ভূমিকা রাখছে।

এমা ওয়ালের ভাষায়, ‘দুনিয়া যখন অস্থির হয়ে ওঠে, স্বর্ণ তখন তার স্বভাবসুলভ কাজটাই করে—বাণিজ্যিক উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক ফাটল এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে লাফিয়ে দাম বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও চীনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, এমনকি ওয়াশিংটনে সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েছে।’

এমা ওয়ালের মতে, স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণকে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ তাদের বিশ্বাস, এতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ভরতা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়। রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ ইউক্রেনের সমর্থক বৈশ্বিক শক্তিগুলো কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই কিছু দেশ লক্ষ করেছে। তার পর থেকে তারা স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরপেক্ষ রিজার্ভ হিসেবে বেশি আকর্ষণীয় মনে করছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি শুধু আমদানি-রপ্তানির হিসাব বদলাচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকেও চাপের মুখে ফেলছে। ইউরোপ, চীন ও কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এই অনিশ্চয়তার সময় ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, আর সোনাই সেখানে প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে।

ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও সোনার বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বিশ্ব রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নানা হুমকি ও বাগাড়ম্বর, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এসব ঘটনায় মার্কিন ডলারের ওপর আস্থাও দুর্বল হয়েছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ হামাদ হোসেন বলেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও আর্থিক নীতির ঝুঁকির বিপরীতে স্বর্ণকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এ কারণেই এই মূল্যবান ধাতুটি এখন ‘আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে’ রয়েছে।

ডলার দুর্বল হলে সাধারণত সোনার দাম বাড়ে। কারণ, ডলারের মূল্যায়িত সোনা তখন অন্যান্য মুদ্রাধারী বিনিয়োগকারীর কাছে তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে। সম্প্রতি ডলারের সূচক কমার সঙ্গে সঙ্গে সোনার দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়। একই কারণে রুপা ও প্লাটিনামেও বিনিয়োগ বেড়েছে।

সোনার দামের পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ কমিয়ে সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দ হওয়ার ঘটনা অন্যান্য দেশকে সতর্ক করেছে। নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক ঝুঁকিমুক্ত সম্পদ হিসেবে সোনার প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বেড়েছে।

চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা ক্রেতাদের একটি। দেশটিতে ব্যক্তিগতভাবে গয়না কেনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও বেড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরাও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সোনা-সংক্রান্ত কোম্পানিতে অর্থ ঢালাচ্ছেন। কিছু বড় বিনিয়োগকারী বিপুল পরিমাণ সোনা কিনেছে, যা দামের ঊর্ধ্বগতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

দামের ঊর্ধ্বগতি অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কেননা আশঙ্কা করা হচ্ছিল, ট্রাম্প এমন একজনকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে পারেন, যিনি তাঁর সুদের হার কমানোর দাবিতে নতি স্বীকার করবেন। এতে ডলারের দরপতন এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব পরিস্থিতিতে স্বর্ণ কেনাকে সুরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু পরে যখন খবর আসে যে প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ার্শকে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাঁকে অন্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল হিসেবে দেখা হয়; তখন স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামের দাম হঠাৎ করেই কমে যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতন সাময়িক। চলমান যুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা, নতুন শুল্ক আরোপের শঙ্কা এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে অনিশ্চয়তা সোনার বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখবে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার আবেদন তাই ফুরিয়ে যায়নি।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের নানা নীতি ও বাগাড়ম্বর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেই নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্য ও পণ্যের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে সোনার দামের সাম্প্রতিক ওঠানামায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত