Ajker Patrika

চলছে বালু লুটের মহোৎসব

  • নদীর তীর কেটে বালু তোলায় হুমকিতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট
  • শ্রমিকেরা অভিযানে আটক হলেও নেপথ্যের প্রভাবশালীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
  • লোকদেখানো অভিযান নয়, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে: পরিবেশকর্মী
  • জেলা প্রশাসনের দাবি, বালু লুট বন্ধে নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চলছে
বিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ
চলছে বালু লুটের মহোৎসব
দিনদুপুরে নদীর পাড় কেটে বালু লুট করছে একটি চক্র। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার পূর্ব সোনাপুর গ্রামসংলগ্ন মরাচেলা নদী এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ধোপাজান ও মরাচেলা নদীতে চলছে বালু লুটের মহোৎসব। মামলা, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনের অভিযান—কোনো কিছুতেই থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। নদীর বুক ও তীর কেটে বালু লুটে ধ্বংস করা হচ্ছে প্রকৃতি-পরিবেশ, হুমকির মুখে পড়ছে জনপদ, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রভাবশালী চক্রের বেপরোয়া লুটপাট চললেও অভিযানে আটক হচ্ছেন শ্রমিকেরা, ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন নেপথ্যের হোতারা।

বালু লুট বন্ধে বিভিন্ন সময় আন্দোলনও করেন এলাকাবাসী। তবে তাতেও থামে না লুটেরাদের দৌরাত্ম্য। সর্বশেষ ৪ অক্টোবর দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীর কাজিরগাঁও এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়। পরে ৬ অক্টোবর মরাচেলা নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু তোলায় ৩৭ জনের নামে মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

মামলার এজাহারে ২৫ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ দিনে মরাচেলা থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকার ২৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

এর আগে অবৈধভাবে ধোপাজান ও যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে শত শত কোটি টাকার বালু উত্তোলনের অভিযোগেও মামলা হয়েছে। মামলার গতি-প্রকৃতি থেমে থাকলেও থেমে নেই বালু লুটের কার্যক্রম।

সম্প্রতি দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা মরাচেলা নদীর পূর্ব সোনাপুর অংশে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড় কেটে দেদার বালু তোলা হচ্ছে নৌকায়। নিজেদের সীমানায় নদীর পাড় কাটা ঠেকাতে কয়েকজন বাধা দিলেও মানছে না বালু লুটকারীরা।

নদীর পাড় কাটা তীরে ছাতা মাথায় হাঁটাহাঁটি করছিলেন পূর্ব সোনাপুর গ্রামের আমির হামজা। বালু উত্তোলন রোধে নদীতীরবর্তী নিজ সীমানা পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি। একাধিকবার বালু না তুলতে শ্রমিকদের শাসাতেও দেখা যায় তাঁকে। আমির হামজা বলেন, ‘এই গ্রামের ছিদ্দিক মিয়া, তার ভাই-ভাতিজারা এইডা নিয়ন্ত্রণ করতাছে। সঙ্গে বাইরের আরও ২০-৩০ জন আছে। বাধা দিলেও মানে না। তারা আমিসহ আমার ভাইরে মারধর কইরা হাসপাতালে পাঠাইছে।’ পাশে দাঁড়ানো একই গ্রামের বালুশ্রমিক আসগর আলী তাঁর কথায় সায় দিয়ে বলেন, ‘ছিদ্দিক, হামিদ, কাদির, মুরছালিন, আব্দুর রহমানরা জোর কইরা এরার (আমির হামজাদের) জায়গা খাইতাছে। বাধা দেওয়ায় তারা দুই ভাইরে মারছে। এদের সঙ্গে ছাতক, কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বড় বড় মানুষ আছে। আমরা চাই না, আমরার বাড়িঘর ভাঙুক।’

বালু তোলায় বিলীনের পথে বসতভিটা। সম্প্রতি তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীতীরবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
বালু তোলায় বিলীনের পথে বসতভিটা। সম্প্রতি তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীতীরবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

আসগর আলী জানান, কয়েক দিন আগে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছে। প্রতিবাদের মুখে শ্রমিকেরা নদী থাইক্যা নৌকা নিয়া পালাইছে। পর দিন জোর কইরা আবার নদীর পাড় কাটা শুরু করছে। তাদের হামলা-মামলা করে নানাভাবে হয়রানির অভিযোগ করেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেশের পটপরিবর্তনের পর জেলার বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা নদীতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল লুটেরা চক্র। তখন সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরে ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জেলা প্রশাসন। ২৯ সেপ্টেম্বর আগের এক ইজারাদারের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বালু উত্তোলন তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন আদালত। যে কারণে যাদুকাটা নদী এখন ইজারাবিহীন অবস্থায় আছে। তবে যাদুকাটা তীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইজারা স্থগিত থাকলেও বালু লুটের মহোৎসব থামেনি।

একই অবস্থা সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজান বালুমহালের। জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে ধোপাজান কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুরু হয় লুটপাট। সমালোচনার মুখে প্রশাসনের তৎপরতায় বন্ধ হয় বালু উত্তোলন। গত বছরের অক্টোবরে সরকারি সিদ্ধান্তে ধোপাজানে আবার বালু উত্তোলন শুরু হলে চলতে থাকে বালু লুটের মহোৎসব। প্রশাসন সিসি ক্যামেরায় নজরদারি জোরদার করলেও লুটপাট থামছে না।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘নদীর পাড় কেটে বালু তোলায় ভূপ্রকৃতি পরিবর্তন ও পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। লোকদেখানো অভিযানের পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

কাসমির রেজা বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া বালু লুটের মতো অপকর্ম সম্ভব না। যখন যে আসে খোলস পাল্টে তার ছায়ায় চলে যায় স্থানীয় বালুখেকোরা। এদের ব্যবহার করে প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা ফায়দা লুটছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে বালু লুট ঠেকানো যাবে না।’

ইজারাবিহীন নদীতে বালু লুটের বিষয়টি স্বীকার করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। তিনি বলেন, জেলার ৪টি বালুমহালের মধ্যে যাদুকাটা ও মরাচেলা নিয়ে সমস্যা আছে। বালু লুট ঠেকাতে প্রশাসন নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত