Ajker Patrika

বেলকুচির শেরনগর মধ্যপাড়া: শিল্পবর্জ্যে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ

  • অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বছরজুড়ে জলাবদ্ধতা।
  • বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ে মশার উপদ্রব।
আব্দুল্লাহ আল মারুফ, সিরাজগঞ্জসবুজ সরকার, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ)
বেলকুচির শেরনগর মধ্যপাড়া: শিল্পবর্জ্যে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ
ঘর থেকে পা বাড়ালেই কালচে নোংরা পানি। ময়লা-আবর্জনা পচে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এর মধ্যেই বসবাস করতে হয় স্থানীয়দের। গতকাল সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার শেরনগর মধ্যপাড়ায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঘরের আঙিনাজুড়ে কালচে পানি। পানির ওপর ভাসছে ময়লা-আবর্জনা। বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ে মশার উপদ্রব। এমন পরিবেশে বছরের পর বছর বসবাস করছে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌরসভার শেরনগর মধ্যপাড়ার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সুতা প্রক্রিয়াজাত কারখানার বর্জ্যপানি এবং অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতায় তাঁদের এই দুর্ভোগ। বৃষ্টি হলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, শেরনগর মধ্যপাড়ার বিভিন্ন বাড়ির সামনে এবং সরু সড়কে জমে আছে ময়লা পানি। কোথাও ড্রেনের পানি উপচে উঠছে, কোথাও আবার স্থির হয়ে থাকা পানিতে জন্ম নিয়েছে মশা। দুর্গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর।

স্থানীয় আব্দুল হালিম মণ্ডলের বয়স ৬৫ বছর। একসময় তাঁতশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এখন বয়সের ভারে অনেকটাই কর্মহীন। ঘরের সামনে জমে থাকা নোংরা পানি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না। টিউবওয়েলের পানিতেও গন্ধ। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি উঠে যায়। এই এলাকার কথা শুনে অনেকে আত্মীয়তা করতে চায় না। ছেলে-মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এলে লোকজন এসে না বসেই চলে যায়।’

হালিম মণ্ডল বলেন, ‘১৫-১৬ বছর ধরে এই ভোগান্তি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। পৌরসভা থেকে একবার মশা মারার ওষুধ ছিটিয়েছিল। কিন্তু মশা কমেনি, বরং আরও বেড়েছে।’

শুধু আব্দুল হালিম নন, স্থানীয়দের দাবি, শেরনগর মধ্যপাড়া এবং আশপাশের ৫০০-৭০০ পরিবারের অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ একই দুর্ভোগে আছে।

আলেয়া বেগম নামের এক গৃহবধূ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ঘরে থাকা যায় না। পানি উঠে যায়। অনেক সময় আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হয়। আমরা গরিব মানুষ, কোথায় যাব? সামনে ঈদ। আবার বৃষ্টি হলে ঘরে ঈদ করা কঠিন হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, মুকন্দগাতী, চন্দনগাতী, কামারপাড়া ও শেরনগরের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনের পানি এসে এই এলাকায় জমা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি সুতা প্রক্রিয়াজাত কারখানার বর্জ্যপানিও এখানে এসে পড়ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করলে হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তি কমবে।

ওই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, মাসখানেক আগে পৌরসভার উদ্যোগে এলাকায় লাখ লাখ টাকায় একটি নালা খনন করা হলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি, বরং পানি আরও বেশি আটকে থাকছে।

আজকের পত্রিকার পরিচয় দিয়ে এ বিষয়ে খাল খননের কাজের সঙ্গে যুক্ত ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলম প্রামাণিকের বক্তব্য জানতে মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি বলেন, আপনি বলার কে? আপনি বেলকুচি থানার ওসি নাকি ইউএনওর দায়িত্ব পেয়েছেন বলে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সমস্যাটি চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধ ও মশার যন্ত্রণা নিয়েই দিন কাটছে শেরনগরের মানুষের।

শিক্ষার্থী রাহাত জানায়, বৃষ্টি হলে ১০-১৫ দিন স্কুলে যেতে পারে না। খেলাধুলাও করতে পারে না।

মোছা. হাশমত আরা নামের এক গৃহবধূ বলেন, ‘বৃষ্টি হলে কোমরপানি হয়। রান্নাবান্না করা যায় না। অন্য কোথাও গিয়ে থাকার সামর্থ্যও নেই আমাদের।’

স্থানীয় মুদিদোকানি শমসের আলী বলেন, ‘পানির গন্ধে দোকানে বসা কষ্ট হয়ে যায়। এভাবে কত দিন চলবে বুঝতে পারছি না।’

বেলকুচি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য পৌরসভার রাজস্ব তহবিল থেকে খাল খননের জন্য ১ কিলোমিটার কাজ শুরু করা হয়েছে। ৩০০ মিটার খাল খনন শেষ হয়েছে। কিছু জটিলতার কারণে বাকি কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। জটিলতা শেষ হলে ৭০০ মিটার খাল খনন করা হবে। পানি নিষ্কাশনের জন্য মাস্টার ড্রেন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক আফরিন জাহান হোয়াটসঅ্যাপে জানান, বিষয়টি পৌরসভা গুরুত্বসহকারে দেখছে। এটার অংশ হিসেবে শেরনগর খাল/নালা খনন/সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়াসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

পৌর প্রশাসক আরও জানান, বেলকুচি পৌরসভা এলাকায় মাস্টার ড্রেন না থাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তাঁতশিল্পের বর্জ্য পানি বন্ধে পৌরসভা নিয়মিত মনিটরিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ঈদের আগে ড্রেন পরিষ্কারসহ রুটিন কাজ চলবে। এ ছাড়া জরুরি পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনে পাম্প ব্যবহার করা হবে। এমপি মহোদয়ের সঙ্গে পরামর্শক্রমে শেরনগর ব্রিজ থেকে ক্ষিদ্রমাটিয়া স্লুইসগেট পর্যন্ত একটি মাস্টার ড্রেন প্রকল্প খুব দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা প্রক্রিয়াধীন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বছরের পর বছর দলবদ্ধ ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেল, বিচার না পেয়ে দুই বোনের আত্মহত্যা

ইরানের নতুন রণকৌশল: হরমুজের তলদেশ নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান

বিনা খরচে কারিনা কায়সারের মরদেহ দেশে আনছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস

জেরুজালেমের কাছে বিশাল বিস্ফোরণ, ইসরায়েল বলছে ‘পূর্বপরিকল্পিত পরীক্ষা’

লাগবে না হরমুজ—পাইপলাইন ও রেলে আসবে উপসাগরীয় তেল!

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত