হুইপের ঘোষণায় ক্ষোভ, পূর্বনির্ধারিত স্থানেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চান শরীয়তপুরবাসী

শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত স্থান জেলা সদর থেকে সরিয়ে পূর্ব ডামুড্যায় নির্ধারণের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে জেলাজুড়ে। জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর এ ঘোষণার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্বনির্ধারিত স্থানে প্রতিষ্ঠার দাবিতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা ১১টায় শরীয়তপুর জেলা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংলগ্ন শরীয়তপুর-ঢাকা সড়কে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
‘জাগো শরীয়তপুরের’ ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে সদর, নড়িয়া, জাজিরাসহ বিভিন্ন উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এতে বক্তব্য দেন সংগঠনটির আহ্বায়ক আমিন মোহাম্মদ জিতু, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমরান আল নাজির, শরীয়তপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সামাদ ব্যাপারীসহ অনেকে।
বক্তারা বলেন, শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, আবাসন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে জেলা শহরের কাছাকাছি শরীয়তপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই স্থান বাদ দিয়ে জেলার এক প্রান্তে হুইপের নিজ এলাকায় ক্যাম্পাস স্থাপনের ঘোষণা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তাঁদের দাবি, নতুন প্রস্তাবিত স্থানটি ডামুড্যা ও গোসাইরহাট উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হলে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আবাসন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা-সহায়ক পরিবেশ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো নির্দিষ্ট এলাকার উন্নয়নের জন্য নয়; বরং এটি পুরো জেলার উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তাই ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণে কোনো একটি এলাকার স্বার্থের চেয়ে জেলার সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা, নাগরিক সুবিধা, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
মানববন্ধন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জেলা শহরের কাছাকাছি শরীয়তপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে পূর্বনির্ধারিত স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান অংশগ্রহণকারীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন তাঁরা।
মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের অক্টোবরে শরীয়তপুরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বছরের ১২ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে খসড়া আইন প্রণয়নের জন্য চিঠি দেয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন প্রণয়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি খসড়া আইনটি অনুমোদিত হয়। একই বছরের ১২ জুন মন্ত্রিসভায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০২৩ চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। পরে ১৩ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির গেজেট প্রকাশ করা হয়। শুরুতে এর নাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শরীয়তপুর’।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে ‘শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ রাখা হয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখরকে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়।
১৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখর ও শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা ইউনিয়নে জমি পরিদর্শন করেন হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু। পরিদর্শন শেষে ওই এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের ঘোষণা দেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হুইপ বলেছিলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এবং কম দামে জমি পাওয়ায় পূর্ব ডামুড্যা এলাকায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন চায়ের দোকান, আড্ডা ও জনপরিসরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে পূর্বনির্ধারিত স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন শুরু করেন স্থানীয়রা।









