Ajker Patrika

শরীয়তপুরে হাসপাতালে চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৬

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
শরীয়তপুরে হাসপাতালে চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৬
হাসপাতালে হামলার শিকার ডা. নাসির ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসক নাসির ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে।

আজ শনিবার (১৬ মে) সন্ধ্যার পরে হাসপাতালের চিকিৎসক আকরাম এলাহি বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে পালং মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এদিকে ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা সিভিল সার্জন। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. রেহান উদ্দিন বলেন, চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় সদর হাসপাতালের চিকিৎসক আকরাম এলাহি বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৫০ জনকে আসামি করে পালং মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বলা হয়েছে পাঁচ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য।

পালং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, হামলার ঘটনায় আজ সন্ধ্যায় ডা. আকরাম এলাহি বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে এটি মামলা দায়ের করেছেন। এ পর্যন্ত ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর বিলাসখান এলাকার লাল মিয়া কাজী (৫০) হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। রাত ১২টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

চিকিৎসকের অবহেলায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ এনে রাত ১টার দিকে নিহত লাল মিয়া কাজীর স্বজনসহ ৪০-৫০ জন মিলে চিকিৎসক নাসির ইসলামের ওপর হামলা চালান। হামলাকারীরা ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডে ঢুকে দায়িত্বরত চিকিৎসক নাসির ইসলামকে মারতে মারতে রুম থেকে বের করে আনেন।

এ সময় হাসপাতালের অফিস সহায়ক এসকেন্দার ও ৫ আনসার সদস্য চিকিৎসককে উদ্ধার করতে গেলে তাঁদেরকেও মেরে আহত করা হয়।

তখন হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাতেই সোলাইমান কাজী (আল আমিন) ও জসীম উদ্দিন নামে দুজনকে আটক করে পুলিশ।

রাতেই চিকিৎসক নাসির ইসলামকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় আজ দুপুরে তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়।

গুরুতর আহত ডা. নাসির ইসলামকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত
গুরুতর আহত ডা. নাসির ইসলামকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সদর হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাসির ইসলামকে রুম থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করছে কিছু লোক। এরপর শুরু হয় কিলঘুষি। নিজেকে রক্ষায় একাধিকবার চেষ্টা চালালেও ব্যর্থ হন তিনি। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও ক্ষান্ত হয়নি হামলাকারীরা। একপর্যায়ে তাঁকে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে চালানো হয় কয়েক দফা হামলা। এতে মাথা ফেটে গুরুতর আহত হন ওই চিকিৎসক। এই ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি দোষী ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকের স্বজনেরা।

সকালে হাসপাতালে যান শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ, জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম ও পুলিশ সুপার রওনক জাহান। তাঁরা হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন।

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মিতু আক্তার বলেন, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ওই রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে স্বজনেরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাননি। পরে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে সদর হাসপাতালেই চিকিৎসা চলছিল। একপর্যায়ে তিনি মারা যান। এরপর রোগীর স্বজনেরা হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর ও দায়িত্বরত চিকিৎসকের ওপর হামলা চালান। আহত চিকিৎসকের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। আজ দুপুরের দিকে তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এই ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আহত চিকিৎসকের বড় ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই ৪৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে তিন মাস আগে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হয়। ভুল বুঝে তার ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালায়। একজন চিকিৎসক যদি হাসপাতালে নিরাপদ না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে চিকিৎসাসেবা দেবে। আমরা এই ঘটনায় দোষীদের বিচার দাবি করছি।’

শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার রওনক জাহান বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলছে, জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, হাসপাতালে হামলা ও চিকিৎসকদের ওপর আক্রমণের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আহত চিকিৎসকের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ আসলাম বলেন, ‘চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। হামলাকারীদের পরিচয় যা-ই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত