Ajker Patrika

রংপুরে সরকারি কোয়ার্টার: কর্মকর্তাদের নামে বরাদ্দ থাকছেন ভাড়াটেরা

শিপুল ইসলাম, রংপুর
রংপুরে সরকারি কোয়ার্টার: কর্মকর্তাদের নামে বরাদ্দ
থাকছেন ভাড়াটেরা
ডাক বিভাগের স্টাফ কোয়ার্টার। এর ফ্ল্যাটগুলো সরকারি কর্মকর্তাদের নামে বরাদ্দ থাকলেও থাকেন ভাড়াটেরা। সম্প্রতি রংপুর মহানগরীতে। ছবি: আজকের পত্রিকা

রংপুরে সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ পেয়েও সেখানে থাকছেন না ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে। নিজেদের নামে বরাদ্দ নেওয়া ফ্ল্যাট ভাড়া ও সাবলেট দিয়েছেন তাঁরা। তিনটি কোয়ার্টারের ১৫টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৬টিতে ভাড়াটে থাকার তথ্য মিলেছে। অথচ সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট দপ্তর বরাদ্দপ্রাপকদের কাছ থেকে ভাড়াটে না থাকার প্রত্যয়ন নিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে এমন অনিয়ম চললেও কোয়ার্টারগুলোতে সরেজমিন যাচাই করেনি কর্তৃপক্ষ।

সরকারি আবাসন পরিদপ্তর সম্প্রতি এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বরাদ্দপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীকে নিজ নামে বরাদ্দের বাসায় বসবাস করতে হবে। অন্যের কাছে ফ্ল্যাট বা কক্ষ ভাড়া কিংবা সাবলেট দেওয়া যাবে না। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ভাড়াটে ও সাবলেটবাসীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও ছিল। এরপর কোনো ফ্ল্যাটে ভাড়াটে পাওয়া গেলে বরাদ্দ বাতিলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

কিন্তু রংপুরের ডাক বিভাগের পোস্টাল স্টাফ কোয়ার্টারে দেখা গেছে, সরকারি নির্দেশনার পরও বরাদ্দপ্রাপকদের পরিবর্তে অন্যরা ফ্ল্যাটগুলোতে বসবাস করছেন।

কয়েকজন বরাদ্দপ্রাপক ভাড়াটে রাখার বিষয়টি স্বীকার করে তাঁদের ভুল হয়েছে বলে জানিয়েছেন। কেউ কেউ ভাড়াটেদের চলে যেতে বলার কথাও জানিয়েছেন।

নগরীর ধাপ এলাকায় ডাক বিভাগের পাঁচটি পোস্টাল কোয়ার্টার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে দুটি পরিত্যক্ত। বাকি তিনটির একটি চারতলা ও একটি তিনতলা ভবনে মোট ১৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে ৬টি বহিরাগতদের ভাড়া দেওয়া হয়। এ ছাড়া কয়েকটি ফ্ল্যাটে বরাদ্দপ্রাপকের পরিবর্তে অন্যরা বসবাস করছেন এবং কোনো কোনো ফ্ল্যাটে কিছু কক্ষ সাবলেট দেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চারতলা কোয়ার্টারে গিয়ে ৮টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৪টিতে ভাড়াটে পাওয়া যায়। পাশের তিনতলা ভবনের ৬টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১টিতে ভাড়াটে এবং ২টি ফ্ল্যাটে সাবলেটে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়া যায়। পাশের আরেকটি কোয়ার্টারের ১টি ফ্ল্যাটেও ভাড়াটে রয়েছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।

চারতলা কোয়ার্টারের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা ডাকঘরের পোস্টম্যান শরিফুল ইসলামের নামে। তবে সেখানে থাকছেন স্কুলশিক্ষিকা আফরোজা খাতুন বেবি।

একই তলার আরেকটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে রংপুর প্রধান ডাকঘরের অপারেটর তৌহিদুল ইসলামের নামে। সেখানে থাকছেন লাভলী বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী নেই। তৌহিদুলের নামে বরাদ্দ থাকলেও এখানে আমি থাকি। সরকারি ভাড়া যেটা কাটে, সেটা তাঁকে দিই।’ তৌহিদুলের মোবাইলে কল দেওয়া হলে ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

একই ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ রয়েছে রংপুর প্রধান ডাকঘরের প্যাকার কাম মেইল ক্যারিয়ার লুৎফর হাবিব রানার নামে। ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়েছেন জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তিকে।

এ বিষয়ে জানতে লুৎফরের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘ব্যস্ত আছি। এ বিষয়ে পরে কথা বলব।’

একই তলার অন্য একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ রয়েছে রংপুর বিভাগীয় পোস্ট অফিসের অফিস সহায়ক জহির উদ্দিনের নামে। সেখানে বসবাস করছেন সুমাইয়া আক্তার শিমু। তাঁর স্বামী মঈনুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘জহির ভাই পোস্ট অফিসে চাকরি করেন। উনি এখানে থাকেন না। আমরাই থাকি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জহির বলেন, ‘আমার এটা ভুল হয়েছে। এখন তাঁকে ওখান থেকে চলে যেতে বলব।’

পাশের তিনতলা কোয়ার্টারের নিচতলার একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে ডাক জীবনবিমা রংপুরের সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. সবুজ আহমেদ সবুরের নামে। সেখানে পরিবার নিয়ে থাকছেন ফজলুল হক।

ফজলুল বলেন, ‘আমি ভাড়ায় থাকি। মাসে ছয় হাজার টাকা ভাড়া দিই।’ ভুল স্বীকার করে সবুজ আহমেদ বলেন, ‘তাঁদের চলে যেতে বলেছি। বাসা পেলে তাঁরা চলে যাবেন।’

প্রত্যয়ন নিয়েছে দপ্তর, যাচাই হয়নি

ডাক বিভাগের পোস্টাল কোয়ার্টারে ভাড়াটে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর বিভাগীয় অফিসের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল ইসরাত জাহান নূর বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমরা চিঠি দিয়েছি। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সবার কাছ থেকে প্রত্যয়ন নিয়েছি যে তাঁদের বাসায় কোনো ভাড়াটে নেই। আমাকে এখন ক্রসচেক করতে হবে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী যে ব্যবস্থা হবে, তা-ই নেওয়া হবে।’

সরেজমিনে ভাড়াটে থাকার বিষয়টি যাচাই করেছেন কি না, এমন প্রশ্নে ইসরাত জাহান বলেন, ‘কোয়ার্টারে গিয়েছি বলতে এমপিসিতে নিয়মিত যাতায়াত করা হয়। কোয়ার্টারের ভেতরে ভাড়াটে আছে কি না, আসলে ওইভাবে বলতে পারব না।’

উত্তরাঞ্চল রাজশাহীর অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল মো. আনোয়ার হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রত্যয়ন দেওয়ার পরও যদি ভাড়াটে থাকে, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা সম্পূর্ণ অবৈধ।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত