Ajker Patrika

দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত অধ্যক্ষকে পুনর্বহালে অসন্তোষ, সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজে অবচলাবস্থা

রংপুর প্রতিনিধি
দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত অধ্যক্ষকে পুনর্বহালে অসন্তোষ, সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজে অবচলাবস্থা
সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রায় দুই বছর ধরে নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও কাগজে-কলমে রংপুর নগরীর সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মো. শাহজাহান। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর অনুপস্থিতিতে একাধিক শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। তবে সর্বশেষ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কলেজটিতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত এবং প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা চলমান থাকলেও অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। অন্যদিকে তাঁর অনুপস্থিতির কারণে পাঠদান ব্যাহত হওয়া, প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং শিক্ষকদের উপস্থিতি শিথিল হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়োগ বাণিজ্য, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের মতো নানা অনিয়মে জড়িয়েছিলেন অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি ২১ আগস্ট থেকে এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছা. শহিদা আক্তার বানু ২৫ আগস্ট থেকে প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করে দেন। পরে অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান। ছবি: সংগৃহীত
সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন অধ্যক্ষ অনুপস্থিত থাকায় ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুরের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল মান্নান দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক মো. আ. ত. ম. মকছুদার রহমানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন। তিনি ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল অবসরে গেলে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম। পরে একই বছরের ২৬ অক্টোবর দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদ সিনিয়র শিক্ষক মো. মোস্তফা জামানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন।

এরপর চলতি বছরের ১৮ মে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদ এক চিঠির মাধ্যমে ১৬ মার্চ থেকে কার্যকর দেখিয়ে মোস্তফা জামানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন এবং অধ্যক্ষ মো. শাহজাহানকে পুনর্বহাল করেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গভর্নিং বডির ১২ মার্চের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুসারে সাময়িক বরখাস্তের ১৮০ দিন অতিক্রম হওয়ায় অধ্যক্ষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজ পদে বহাল হয়েছেন। তাই তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ উঠেছে, সেই তদন্ত প্রতিবেদন এখনো অধিদপ্তরে পাঠানো হয়নি।

ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা জামানের দাবি, অধ্যক্ষকে বরখাস্ত কিংবা পুনর্বহালের বিষয়ে গভর্নিং বডির কোনো সভায় সিদ্ধান্ত হয়নি। ব্যাকডেটে বরখাস্ত দেখিয়ে একক সিদ্ধান্তে তাঁকে পুনর্বহাল করা হয়েছে।

মোস্তফা জামান বলেন, ‘গভর্নিং বডির মতামত ছাড়াই তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক একক ক্ষমতাবলে অধ্যক্ষকে পুনর্বহাল করেন।’

দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান না করেই অধ্যক্ষ এমপিও-সংক্রান্ত পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে তাঁর ঈদুল আজহার উৎসব ভাতা এবং মে মাস থেকে বেতন স্থগিত রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন মোস্তফা জামান। এ বিষয়ে তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় পাসওয়ার্ড থাকায় ষষ্ঠ, নবম ও একাদশ শ্রেণির প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির আবেদন নির্ধারিত সময়ে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তারা চলতি বছরের উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে সরেজমিনে সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষক অফিসকক্ষে বসে সময় কাটাচ্ছেন। কয়েকজন শিক্ষক অনুপস্থিত। অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে না। নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরে গেছে।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী গোলাম রব্বানী বলে, ‘তিন-চার মাস ধরে ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না। শুনেছি অধ্যক্ষ দায়িত্বে আছেন। কিন্তু তাঁকে দুই বছর ধরে স্কুলে দেখিনি। অনেক শিক্ষকও নিয়মিত আসেন না।’

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জিএম কাদের জানান, উপবৃত্তির টাকা না পাওয়ার বিষয়ে শিক্ষকদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জেসমিন আক্তার জুলি অভিযোগ করে, অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে আসেন না। অনেক শিক্ষকও নিয়মিত ক্লাস নেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিয়মিত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

সহকারী শিক্ষক কৃষ্ণ বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিতি নেওয়া হলেও পরে কার্যবিবরণীতে কী লেখা হয়, তা সদস্যদের জানানো হয় না। তিনি দাবি করেন, যে তারিখের সভার সিদ্ধান্ত দেখিয়ে অধ্যক্ষকে পুনর্বহাল করা হয়েছে, সে দিন কোনো সভাই হয়নি।

সহকারী শিক্ষক শাহ আলম বলেন, ‘অধ্যক্ষ কবে বরখাস্ত হয়েছেন, কবে পুনর্বহাল হয়েছেন—এসব বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

সিনিয়র শিক্ষক সিরাজুল ইসলামও জানান, অধ্যক্ষ নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে আসেন না।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান বলেন, তিনি মাঝেমধ্যে প্রতিষ্ঠানে যান। তাঁর ভাষ্য, হাজিরা খাতা লুকিয়ে রাখার কারণে তাঁকে অনুপস্থিত দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বেতন বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁর নিজের বেতন দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা চালু হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই মোস্তফা জামানের বেতন বন্ধ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এ দাবির পক্ষে মন্ত্রণালয়ের কোনো লিখিত নির্দেশনা দেখাতে পারেননি।

উপবৃত্তির বিষয়ে তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় আবেদনপত্র ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজের কাছে রাখায় সময়মতো জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণে শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি পায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. এনায়েত হোসেন বলেন, ‘অধ্যক্ষ শাহজাহানকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজ পদে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে তিনি নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন কি না, সেটি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা জামানের বেতন বন্ধের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে উপবৃত্তি না পাওয়ার ঘটনায় কার গাফিলতি রয়েছে, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুরের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) খৃষ্টফার হিমেল রিছিল বলেন, তিনি সম্প্রতি অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত