Ajker Patrika

দশমিনায় তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে বেড়িবাঁধ ও সড়ক বিলীন, ঝুঁকিতে ঘরবাড়ি-কবরস্থান

দশমিনা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি 
দশমিনায় তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে বেড়িবাঁধ ও সড়ক বিলীন, ঝুঁকিতে ঘরবাড়ি-কবরস্থান
আজ রাতে তীব্র স্রোতে হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতে হাজিরহাট এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে নদীর তীব্র স্রোতে হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে সড়কের একটি অংশ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া জিওব্যাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে অর্ধশতাধিক বসতঘর ও কবরস্থান হুমকির মুখে পড়েছে।

ভাঙনের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা ও দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম।

সরেজমিন দেখা যায়, হাজিরহাট লঞ্চঘাটের পশ্চিম-উত্তর পাশে নদীর তীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা শতাধিক জিওব্যাগ তীব্র স্রোতের টানে ধসে নদীতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে সংলগ্ন পাকা সড়কের পিচ ও মাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে সড়কের সঙ্গে নদীর সংযোগস্থলে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।

ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকটি বসতঘরের বাসিন্দাদের উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকায় থানা-পুলিশ, নৌ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো মুহূর্তে হাজিরহাট জামে মসজিদ, বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও আশপাশের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তেঁতুলিয়া নদীতে পানির চাপ ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় হাজিরহাট লঞ্চঘাট ও জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ফেলা হলেও সেগুলো স্রোতের টানে নদীতে চলে যাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হাজিরহাট জামে মসজিদ, বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আশপাশের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

আজ রাতে তীব্র স্রোতে হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ছবি: আজকের পত্রিকা
আজ রাতে তীব্র স্রোতে হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ভাঙনের মুখে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা নিজামুদ্দিন বলেন, ‘আজ রাতের মধ্যে (মঙ্গলবার রাত) আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আমার থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় ঘরের মালামাল সরিয়ে নিয়েছি। রাতে হয়তো অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে। আমার বাবা খলিল মিয়া গত বছর মারা গেছেন। আমাদের পারিবারিক কবরস্থানও ঝুঁকিতে রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সন্ধ্যার তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেগুলো রক্ষা করার মতো সময় বা সুযোগ আমরা পাইনি।’ দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকজন গৃহবধূ বলেন, ‘এই ভাঙনের পর আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। জানি না আজ রাত কীভাবে কাটবে। আমাদের স্বজনদের কবরও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাতের মধ্যে ঘরবাড়িও ভেঙে যেতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত ২০-২৫ বছর ধরে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে হাজিরহাট এলাকার হাজার একর ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর নদীর তীব্র স্রোতে পাউবোর নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না হলে বাঁধের বাকি অংশও ভেঙে অর্ধশতাধিক বসতঘর ও কবরস্থান নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।

তাঁরা হাজিরহাট বাজার ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় দ্রুত জিওব্যাগ ডাম্পিং জোরদার এবং স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ‘স্থানীয়দের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসি। নদীর তীব্র স্রোতে রাতের মধ্যেই সড়কের বাকি সংযোগটুকুও ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে কাজ শুরু করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নদীতীরবর্তী ভাঙনকবলিত এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর থেকে কয়েকটি পরিবারকে সরিয়ে হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তাঁদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে। নদীভাঙনে যেসব পরিবার বসতভিটা ও জমিজমা হারাবেন, তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইউএনও জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন, থানা-পুলিশ, নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করবেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত