Ajker Patrika

কাজ না করেই ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ইউএনওর বিরুদ্ধে

ইলিয়াস আহমেদ, ময়মনসিংহ 
কাজ না করেই ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ইউএনওর বিরুদ্ধে
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে কাজ না করেই ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে কাজ না করেই ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে। গেল অর্থবছরে উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন পরিষদের ভবন মেরামত এবং সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দের এ অর্থ উত্তোলন করা হয় গত জুন মাসে। কাগজে-কলমে কাজ বাস্তবায়ন দেখিয়ে টাকা উত্তোলন হলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি।

জানা গেছে, হালুয়াঘাট উপজেলার কৈচাপুর ইউনিয়ন পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিষদটির ভবন মেরামত ও সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। ৩০ জুনের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, বাস্তবে কোনো কাজই হয়নি। যদিও শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

শুধু এই ইউনিয়ন পরিষদ নয়। উপজেলার ধারা, ধুরাইল, গাজিরভিটা, জুগলি এবং স্বদেশি ইউনিয়ন পরিষদের ভবন মেরামত দেখিয়ে জুন মাসে টাকা উত্তোলন হয়েছে ৬০ লাখ। অথচ এ বিষয়ে জানেন না পরিষদের কোনো কর্মকর্তা। ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে কৈচাপুর, ধারা, ধুরাইল এবং গাজিরভিটা ইউনিয়ন পরিষদ গতকাল দিনভর ঘুরে কোনো কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুগলি এবং স্বদেশি ইউনিয়ন পরিষদেও কোনো কাজ হয়নি।

কৈচাপুর ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব সহকারী শফিকুর রহমান বলেন, ‘শুনেছি, বরাদ্দ এলে ভবনের সংস্কারকাজ করা হবে। কিন্তু এখনো কোনো বরাদ্দ আসেনি। দেড় বছর ধরে এখানে চাকরি করছি, এর মধ্যে কোনো ধরনের সংস্কার কাজ হয়নি।’

একই ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সংরক্ষিত সদস্য কুলসুম বেগম বলেন, এখানে কাজ হইলে ঝকঝক করত। কিন্তু কাজ না হওয়ার কারণে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে।

এদিকে ধারা ইউনিয়ন পরিষদের ভবনটির বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। বৃষ্টি হলে কয়েক জায়গায় ছাদের পানি চুইয়ে পড়ে। বাথরুমগুলোর অবস্থা খারাপ। পানির কলগুলো কাজ করে না।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘ভবনটি সংস্কার করা খুব জরুরি। শুনেছি সংস্কারের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু জুন মাস চলে গেলেও কোনো সংস্কার হলো না। এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতেও পারছি না।’

সেবা নিতে আসা রুস্তমপুর গ্রামের সেলিনা বেগম বলেন, ‘কাজে এসে কোথাও বসতে পারছি না। বসার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই।’

ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংস্কারের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে বলে শুনেছি। তবে অর্থ বছরের সময়সীমা পার হয়ে গেলেও কোনো সংস্কার হয়নি। আমাদের ভবনে অনেক সংস্কারকাজ প্রয়োজন। এসব কাজ মূলত উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর করে থাকে। কাজ হওয়ার পর আমাদের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিল ওঠার কথা।’

একই ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল হাসেম বলেন, ‘সংস্কারের জন্য কোনো বরাদ্দ আছে কি না, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কোনো সংস্কারকাজ হতে দেখিনি।’

সংস্কারের বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগের ব্যাপারে আবুল হাসেম বলেন, এ অভিযোগ সত্যি হলে খুব অন্যায় করা হয়েছে।

ধুরাইল ইউনিয়নের বাসিন্দা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির হালুয়াঘাট উপজেলা শাখার প্রধান সমন্বয়নকারী আবু রায়হান বলেন, ‘আমার জানামতে কোনো ধরনের সংস্কারকাজ হয়নি। তাহলে টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে। কারা কেন করল, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।’

গাজিরভিটা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুব্রত দেবনাথ জানান, সম্প্রতি শেষ হওয়া অর্থবছরে কোনো সংস্কার হয়নি।

টাকা উত্তোলনে কথা স্বীকার করেছেন উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়। সেখানকার অডিট অফিসার মঞ্জুরুল ইসলাম খান বলেন, সব নিয়ম মেনেই ৬টি ইউনিয়ন পরিষদের ভবন মেরামত ও সংরক্ষণ বাবদ ৬০ লাখ টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে।

কাজ না করেই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে এমন প্রশ্নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) হালুয়াঘাট উপজেলা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘কাজ চলমান রয়েছে, পরে আবার কথা ঘুরিয়ে বলেন, কাজ শুরু হবে। ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে।’

হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘সময় স্বল্পতার কারণে মন্ত্রণালয়ে লেখালেখি করে অফলাইনে আরএফকিউয়ের মাধ্যমে কাজ সম্পাদনের অনুমতি পাই। ছয়টি ভবনের মেরামতের কাজ তিনজন ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি কাজ শুরু হয়েছে। যেহেতু বলছেন কাজ শুরু হয়নি, তাহলে দ্রুত কাজ শুরুর জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হবে।’

তবে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো.সাইফুর রহমান জানিয়েছেন, অগ্রিম বিল উত্তোলন করলেও ওই অর্থবছরেই কাজ সম্পন্ন করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু আলোচনা উঠছে, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত