Ajker Patrika

আজ মুজিবনগর দিবস

স্বাধীনতার স্মারক এখনো ধ্বংসস্তূপ

মেহেরপুর প্রতিনিধি
স্বাধীনতার স্মারক এখনো ধ্বংসস্তূপ
গুঁড়িয়ে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন ভাস্কর্য। সম্প্রতি মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মৃতিকেন্দ্রে। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মৃতিকেন্দ্র এখনো দর্শনার্থীশূন্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই একশ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল লোকজন সেখানকার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ভাস্কর্যগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশ চালিয়েছে টানা দেড় বছর। দুই মাস আগে নির্বাচনের পর এসেছে নতুন রাজনৈতিক সরকার। কিন্তু দেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভাস্কর্যগুলো সংস্কার বা নতুন করে স্থাপন করা হয়নি আজও। দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ১৭ এপ্রিল এই সরকারের সদস্যরা শপথ নেন মেহেরপুরের তৎকালীন বৈদ্যনাথতলায়। স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এ জনপদের নাম হয় মুজিবনগর। স্বাধীনতার পরে সেখানে গড়ে তোলা হয় মুজিবনগর কমপ্লেক্স। দেশের সর্ববৃহৎ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মানচিত্র রয়েছে এখানেই। এতে পুরো মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরা হয়েছে। ৯টি সেক্টরের যুদ্ধকালীন নানা ঘটনা ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানচিত্রটিতে। এতে আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্য, শরণার্থীদের প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাওয়া, পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা তোলা, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্যের মতো অনেক বিষয়।

দেশ-বিদেশের অনেক দর্শনার্থী এখানে আসেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানটি স্বচক্ষে দেখতে। দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সান্নিধ্য পেতে।

কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্থাপনা না হলেও ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসানের দিনে মুক্তিযুদ্ধের এই স্মারকগুলো হামলার শিকার হয়। একশ্রেণির লোক হামলা চালিয়ে ভেঙে ফেলে মানচিত্রের প্রায় সব ভাস্কর্য। তখন থেকে সেভাবেই পড়ে আছে সব। দেশের আরও অনেক মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক স্থাপনা, ভাস্কর্য বা ম্যুরাল ৫ আগস্টের পর হামলার শিকার হয়।

একসময় কাছের-দূরের দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখর থাকলেও মুজিবনগর কমপ্লেক্সে এখন সুনসান নীরবতা। আয়রোজগার নেই এখানকার ব্যবসায়ীদেরও।

গত মঙ্গলবার কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী মো. নাছিম বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে মার্চের শেষ পর্যন্ত প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী আসত এখানে। কিন্তু ৫ আগস্টের ঘটনার পর থেকেই দর্শনার্থী প্রায় নেই। যেখানে প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হতো, সেখানে ৫০০ টাকা আয় করতে হিমশিম খেতে হয় এখন। অনেকেই দোকান বন্ধ করে অন্য কাজ বা ব্যবসা ধরেছেন।’

ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা কলেজশিক্ষার্থী মীর সিয়াম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এসেছিলাম মুজিবনগর কমপ্লেক্সে। কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছি। কারণ, ৫ আগস্টের পর ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হলেও এখনো সংস্কার বা প্রতিস্থাপন করা হয়নি।’

খুলনা থেকে বেড়াতে আসা গৃহিণী কাজী জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন নিয়ে বেড়াতে এসেছিলাম মুজিবনগরে। প্রায় সবই দেখি ধ্বংসস্তূপ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যদি এখানে ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে, তা সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করা দরকার। এভাবে ভেঙে ফেলা তো সমাধান হয় না। দেশের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি সংস্কারে দ্রুত সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’

মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল আল আমিন ধূমকেতু বলেন, ‘সরকার ছাড়া কোনো রাষ্ট্র হয় না। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল একটি সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল। তাদের নির্দেশনায় পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। সেদিন যদি সরকার গঠন ও শপথ না হতো, তাহলে এই যুদ্ধকে একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করা হতো।’

নির্বিচারে স্থাপত্যগুলো ভাঙার প্রতিবাদ করে আব্দুল আল আমিন বলেন, ‘সরকারের উচিত মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা। যদি কোনো বিষয়ে বিতর্ক থাকে, সেগুলো ঠিক করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা হোক।’

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামাল উদ্দিন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সটিতে ৩০০টি ভাস্কর্য ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে সরকার থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত