Ajker Patrika

মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার: শতবর্ষের কাছাকাছি এসেও ধরে রেখেছে মান

মাদারীপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ২২: ২৬
মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার: শতবর্ষের কাছাকাছি এসেও ধরে রেখেছে মান
মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। ছবি: আজকের পত্রিকা

শত বছর ছুঁই ছুঁই মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। জেলার এমন কেউ নেই যে এই দোকান থেকে মিষ্টি খায়নি। দীর্ঘদিন ঐতিহ্য আর মান ধরে রাখায় জীবন মিষ্টি ভান্ডারের সুনাম বিদেশেও। এ ছাড়া মাদারীপুরের বিয়ে, জন্মদিন, অতিথি আপ্যায়নসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে এই জীবন মিষ্টি না হলে যে চলেই না। এই দোকানের ক্ষীরপুরি আর সন্দেশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তিন প্রজন্মের হাতে চলছে এই দোকান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুরে পুরাতন কোর্ট এলাকায় ১৯৩৭ সালে একটি টিনের ছাপরার ঘরে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই মিষ্টির দোকানের। মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ বাদামতলা এলাকার রাম চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে জীবন মণ্ডল এই দোকান দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। অল্প দিনের মধ্যে দোকানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। পুরাতন কোর্ট, শকুনি লেকসহ ওই সময়ে জেলার গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু অফিস এখানে থাকায় তাঁর মিষ্টি বিক্রিও বেশি হতো। দিনে দিনে জীবন মিষ্টির দোকান পরিচিতি পায়। জীবনের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে কানাই মণ্ডল দোকানের হাল ধরেন। কানাই মণ্ডলেরও বয়স হয়েছে। তিনিও ঠিকমতো দোকানে সময় দিতে পারেন না। তাই বর্তমানে তাঁর ছেলে আকাশ মণ্ডল বাবার দোকানের দায়িত্ব নিয়েছেন।

জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের ক্ষীরপুরি ও সন্দেশ মাদারীপুরবাসীর পছন্দের তালিকায় প্রথম স্থানে আছে। তাই সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক অনুষ্ঠানসহ অতিথি আপ্যায়ন—সবকিছুতেই এখান থেকে মিষ্টি না নিলে যেন অপূর্ণ থেকে যায়। মাদারীপুরের একটা বড় অংশের মানুষ ইতালি, আমেরিকা, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, লন্ডন, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে থাকেন। তাঁরাও বিদেশে যাওয়ার সময় পরিবারের জন্য এবং উপহার হিসেবে জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে মিষ্টি নিয়ে থাকেন। বিশেষ করে ক্ষীরপুরি ও সন্দেশ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এই দুটি মিষ্টিই বেশি বিদেশে যায়।

জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। পুরো দিন ভিড় থাকে এই দোকানে। তা ছাড়া বিশেষ দিনগুলো, সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে আগে থেকে মিষ্টির অর্ডার দিতে হয়। অর্ডার অনুযায়ী মিষ্টি বানিয়ে তা দেওয়া হয়। মাদারীপুরের কিছু কিছু গ্রাহক আছেন, যাঁরা কয়েক দশক ধরে নিয়মিত জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টি কেনেন।

মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। ছবি: আজকের পত্রিকা
মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। ছবি: আজকের পত্রিকা

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, গ্রাম থেকে গরুর খাঁটি দুধ সংগ্রহ করে তা থেকে মিষ্টি বানানো হয়। বর্তমানে পাঁচজন কর্মচারী এতে সহযোগিতা করেন। সবচেয়ে বেশি সময় ও পরিশ্রম করতে হয় ক্ষীরপুরি তৈরি করতে। তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত নেড়ে নেড়ে যত্নসহকারে খাঁটি দুধ বড় কড়াইতে করে জ্বাল দিতে হয়। দুধ ঘন হয়ে এলে এক ঘণ্টা ঘোরাতে হয়। এরপরে মাখনের মতো হলে পরিমাণমতো চিনি দিতে হয়। এরপর আরও আধা ঘণ্টা নেড়ে বড় গামলায় রাখতে হয়। ঠান্ডা হলে ট্রেতে করে ক্ষীর দিয়ে আরও দুই ঘণ্টার পর ছানার ওপরে লেপে দিলেই হয়ে যায় মাদারীপুরের সবচেয়ে সুস্বাদু মাজাদার ক্ষীরপুরি। এরপর পছন্দের তালিকায় রয়েছে সন্দেশ। শীতের সময় খেজুরের গুড় দিয়ে বানানো সন্দেশ আরও বেশি মজাদার হয়। তাঁর দোকানে ক্ষীরপুরি, সন্দেশ, রসমালাই, রসগোল্লা, সাদা ছানা, চমচম, ড্রাই মিষ্টি, কালোজাম, ছানার জিলাপি, দধি, ঘি পাওয়া যায়।

জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক কানাই মণ্ডল বলেন, `প্রতিদিন কত কেজি আর কত টাকার মিষ্টি বিক্রি হয়, তা বলা যাবে না। তবে ভগবানের কৃপায় অনেক ভালো হয়। আমার বাবার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছি, তাই একইভাবে এখনো আমাদের এই দোকানের সুনাম আছে। বিক্রিও অনেক ভালো। আমাদের এই দোকানে প্রতি কেজি ক্ষীরপুরি ৬০০, সন্দেশ ৬০০, সাদা ছানা ৬০০, রসমালাই ৪৫০, চমচম ২৫০, ড্রাই মিষ্টি ২৫০, কালোজাম ২৫০, রসগোল্লা ২০০, ছানার জিলাপি ২০০, দধি ২০০ ও ঘি ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়।'

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন অন্তত ২০ হাজার টাকার ক্ষীরপুরি বিক্রি হয়। সে হিসাবে প্রতি মাসে শুধু ক্ষীরপুরিই বিক্রি হয় ৬ লাখ টাকার। এ ছাড়া সন্দেশ, অন্যান্য মিষ্টি, ঘিসহ মাসে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বিক্রি হয়।

মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, `আমাদের মাদারীপুর জেলাটি ইতিহাসসমৃদ্ধ। এই ঐতিহ্যের মধ্যে মাদারীপুরের জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারও তালিকায় আছে। আর খাবারের তালিকায় ঐতিহ্যবাহী ক্ষীরপুরি যুগ যুগ ধরে সুনামের সঙ্গে চলে আসছে। জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের ক্ষীরপুরির স্বাদ নেয়নি এমন কাউকে জেলায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই সঙ্গে শহর থেকে যাওয়ার সময় প্রিয়জনদের জন্য ক্ষীরপুরি নিতে ভোলেন না। শুধু মাদারীপুর নয়, পাশের জেলা শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ থেকেও মিষ্টিপ্রেমীরা এসে এখানে খেয়ে থাকেন।'

ইতালি থেকে আসা আরিফ হোসেন বলেন, `যখন দেশে আসি, তখন পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের নিয়ে এই দোকানের মিষ্টি খেয়ে থাকি। যখন ইতালি যাই, তখনো এই দোকান থেকে মিষ্টি বিশেষ করে ক্ষীরপুরি নিয়ে যাই। ইতালিতে বাংলাদেশি যে বন্ধুবান্ধব থাকেন, তাঁদের উপহার হিসেবে এই মিষ্টি দিয়ে থাকি। এটা আমাদের মাদারীপুরের ঐতিহ্য।'

জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের আরেক মালিক আকাশ মণ্ডল বলেন, `বর্তমানে বাবা একটু অসুস্থ ও বয়স্ক হয়ে যাওয়ায় আমি বাবার সহযোগিতায় দোকান পরিচালনা করছি। আমাদের এই মিষ্টির সুনাম নিজ জেলাসহ বিদেশেও রয়েছে। মান অটুট রাখায় এত দিন ধরে দোকানের সুনামও আছে।'

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত