Ajker Patrika

পাটগ্রামে এসি ল্যান্ড ও সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য: চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

আজিনুর রহমান আজিম, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) 
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০: ২৪
পাটগ্রামে এসি ল্যান্ড ও সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য: চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
ছবি: আজকের পত্রিকা

লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী পাটগ্রাম উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সহকারী কমিশনার (ভূমি, এসি ল্যান্ড) ও সাব-রেজিস্ট্রারের পদ দুটি শূন্য রয়েছে। কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা পদায়িত না হওয়ায় উপজেলার ভূমি-সংক্রান্ত ও সাধারণ জরুরি সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত মানুষ চরম ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, উপজেলা ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি দুটি সরকারি দপ্তরের ওপর পুরো উপজেলার বাসিন্দাদের জমির মালিকানা, কেনাবেচা, নামজারি ও খাজনা-খারিজসহ নানা আইনি প্রক্রিয়া নির্ভর করে। কিন্তু এই উপজেলায় ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদটিতে স্থায়ী কর্মকর্তা নেই। এই সময়ের মধ্যে ৫ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতিরিক্ত/ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। উপজেলার এই পদটিতে এখন পর্যন্ত ৩৬ জন কর্মকর্তার রদবদল হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৩ জনই ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অপরদিকে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার পদে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়মিত/স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই। এ সময়ে ৮ জন সাব-রেজিস্ট্রার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৭ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ৫০ বছরে ৪০ জন কর্মকর্তা সাব-রেজিস্ট্রার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের মধ্যে ২২ জন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে এসে অতিরিক্ত/খণ্ডকালীন দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রারের মূল কর্মস্থল কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায়। তিনি একই সঙ্গে লালমনিরহাট সদর উপজেলা ও পাটগ্রাম উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। সাপ্তাহিক কর্মদিবসের রোব-সোমবার লালমনিরহাট সদর কার্যালয়ে, মঙ্গল ও বুধবার রাজারহাট এবং বৃহস্পতিবার ১ দিন পাটগ্রাম কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

উপজেলার জমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দপ্তরে স্থায়ী কর্মকর্তাদের পদায়ন না করে অতিরিক্ত বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানোয় স্থবিরতা কাটছে না। বেড়েছে হয়রানি।

পাটগ্রাম ইউএনও ভূমি কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উপজেলা এবং পৌর প্রশাসক হিসেবে আরও দুটি দপ্তরের কাজ করেন। এতে করে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। ফলে জনসাধারণ ভোগান্তির শিকার হন।

ভুক্তভোগী একাধিক সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভূমি সংক্রান্ত কাজে বিশেষ করে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও মালিকানা স্বত্ব বজায় রাখতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজন ছাড়াও অন্যান্য দরকারে উপজেলা ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত দালিলিক প্রমাণ পত্রের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) না থাকায় জমির নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, ভূমি সংক্রান্ত আপত্তি নিষ্পত্তি, সরকারি জমি রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন থেকে চলছে ধীর গতি।

অপরদিকে জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য সাপ্তাহিক কার্যদিবসগুলোতে নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রারের উপস্থিতি না থাকায় প্রয়োজনীয় সময়ে দলিল নিবন্ধনের কাজ করা যায় না। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার এই দুই দপ্তর হতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

উপজেলার জগতবেড় ইউনিয়নের ভেরভেরিরহাট এলাকার রাসেল আলী বলেন, ‘ভূমি অফিসে প্রায় ২ মাস থেকে আসি আর যাই। অফিসার না থাকার জন্য কাজই হয় না। এতে যাতায়াত খরচ বেশি হয়। সময় নষ্ট হয়ে আর্থিক ক্ষতি হয়।’

শ্রীরামপুর ইউনিয়নের চামটির বাজার এলাকার সেলিম হোসেন বলেন, ‘জমি রেজিস্ট্রি করতে অনেক হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। কর্মকর্তা সপ্তাহে একদিন অফিস করে। কাজের ভিড়; দলিল করতে অনেক সময় লাগে। অনেক দিন থেকে এই অফিসের কর্মকর্তা নাই। মানুষের ভোগান্তির শেষ নাই।’

পাটগ্রাম দলিল লেখক সমিতি আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আকতারুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার পদের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থায়ী কর্মকর্তা নাই। কর্মকর্তা না থাকায় কাজের গতি কমে গেছে। সাধারণ মানুষের দাবি, সরকার শূন্য পদে কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে ভূমি ও রেজিস্ট্রেশন সেবায় হয়রানি বন্ধে ব্যবস্থা নেবেন।’

পাটগ্রাম বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শওকত হায়াত প্রধান বাবু বলেন, ‘ভূমি প্রশাসন ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এসব দপ্তরে দীর্ঘদিন কর্মকর্তা না থাকা শুধু জনভোগান্তিই বাড়ায় না, বরং সরকারি রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই জনস্বার্থে দ্রুত এই পদে কর্মকর্তা পদায়ন করা জরুরি।’

এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে জানানো হয়েছে। সম্প্রতি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক সভায় বিষয়টি তুলে ধরে কথা বলেছি। আশা করছি কিছু পরিবর্তন হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত