Ajker Patrika

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ১৯১ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘নিশান গাস্ত’ অনুষ্ঠিত

অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ১৯১ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘নিশান গাস্ত’ অনুষ্ঠিত
পবিত্র আশুরা উপলক্ষে অষ্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় ১৯১ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘নিশান গাস্ত’। ছবি: আজকের পত্রিকা

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে ১৯১ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘নিশান গাস্ত’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ৯ মহররমে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন থেকে হাজারো মানুষ অষ্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ইমামবাড়ায় সমবেত হন। ‘ইয়া হোসাইন (রা.), ইয়া হাসান (রা.)’ ধ্বনিতে শোকাবহ পরিবেশে এই আয়োজন শুরু হয়।

সকাল থেকে কাস্তুল, বাঙালপাড়া, পূর্ব অষ্টগ্রাম, সদর ও দেওঘর ইউনিয়ন থেকে ছোট-বড় শোক মিছিল ঐতিহাসিক হাবেলি প্রাঙ্গণে এসে জড়ো হয়। পরে ভাটির পীরখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক হজরত সৈয়দ আব্দুল করিম আল হোসাইনী (র.) ওরফে সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেবের মাজার ও কেন্দ্রীয় ইমামবাড়া প্রদক্ষিণ করা হয়।

হাবেলির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখানে ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয়; ইমাম হোসাইন (রা.) ও যাঁর মাধ্যমে মহররমের এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে রুহানি সম্পর্ক স্থাপনের নিয়তে এই গাস্ত বা চক্কর দেওয়া হয়।

আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আজ ৯ মহররমে অষ্টগ্রামে পবিত্র আশুরা পালনের চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার ১৯১ বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিলের মধ্য দিয়ে ১০ দিনব্যাপী মহররম পালন কর্মসূচি শেষ হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাবেলি প্রাঙ্গণে ক্রমান্বয়ে মিছিল এসে পৌঁছাচ্ছে। অংশগ্রহণকারীদের মুখে ‘হায় হোসাইন, হায় হাসান’ ধ্বনি ছিল। অনেকের গলা ও মাথায় লাল-কালো কাপড়ে শোকচিহ্ন দেখা যায়। হাবেলির চারপাশে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী মাতম করেন। শোকানুষ্ঠান দেখতে নারী, পুরুষ ও শিশুর ভিড়ও ছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হজরত সৈয়দ আব্দুল করিম আল হোসাইনী (র.) ওরফে আলাই মিয়া নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্রের কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘পবিত্র আশুরা’ পালন শুরু করেন। সেই থেকে বংশপরম্পরায় অষ্টগ্রাম হাবেলি এই শোকানুষ্ঠান পালন করে আসছে।

পবিত্র মহররম মাসের চাঁদ দেখার পর অষ্টগ্রাম হাবেলির ইমামবাড়ায় লাল-কালো নিশান উত্তোলন, নামাজ, জারি, মাতম, মর্সিয়া, ১০টি রোজা, নিরামিষজাতীয় সাধারণ মানতের ভোজন, খালি পায়ে চলা, মাটিতে শয়ন, ফাতেহা পাঠ, তবারক বিতরণসহ নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ১০ মহররমে বাঁশ, রঙিন কাগজ ও কাপড়ে তৈরি কারবালার নিশান ‘তাজিয়া’ মিছিলের মাধ্যমে এ কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।

অষ্টগ্রাম উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অর্ধশত ইমামবাড়া ছাড়াও কিশোরগঞ্জের ভৈরব, হোসেনপুর, ভাগলপুর ও বৌলাই; নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি ও মদন; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও নাসিরনগর; সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক সুলতানশী হাবেলিসহ প্রায় ১০১ গ্রামে শতাধিক ইমামবাড়ায় একই নিয়মে এই শোকাবহ পবিত্র আশুরা পালিত হয়।

আয়োজন উপলক্ষে অষ্টগ্রামে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে হাজারো মানুষ সমবেত হন। ১১ মহররম থেকে স্থানীয় হাটখলা কারবালা এলাকায় শোকের আমেজে আরও দুই দিন ‘লোকজ উৎসব’ চলে।

নছিম মিয়া (৩৮) বলেন, ‘মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতিদের শোকে প্রতিবছর আমরা ১০ মহররম পালন করি। এই দিনে কারবালার হৃদয় নাড়ানো ঘটনার মাধ্যমে ইসলামের পুনর্জাগরণ হয়েছিল। সেই মর্মান্তিক ঘটনা শোকাবহ পরিবেশে স্মরণ করি এবং এর মাধ্যমে আমরা মনের আকুতি প্রকাশ করি যে—৬১ হিজরিতে যদি আমরা থাকতাম, তাহলে এইভাবে সম্মিলিতভাবে আমাদের যা কিছু আছে, তা নিয়ে মিছিলসহ হোসাইনি কাফেলায় অংশ নিতাম, ইয়াজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাম।’

অষ্টগ্রাম হাবেলির সন্তান, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, ‘জালিমদের জুলুমের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন ও নিপীড়িতের প্রতি শোক জানিয়ে ১৯১ বছর ধরে এই আয়োজন চলে আসছে। হোসাইনি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সত্যের প্রতি সম্মান ও মিথ্যার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে থাকি। শোকাবহ মহররম মানুষকে ধৈর্য, ত্যাগ ও ন্যায়ের পথে উদ্বুদ্ধ করে। শোকাবহ মহররমে সুন্নি মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি, সকল মানবের মধ্যে হোসাইনি চেতনা জাগ্রত হবে, সেই প্রত্যাশা রাখি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত