Ajker Patrika

ভাঙছে উপকূলের ঢাল সুন্দরবন

আহসান টিটু, ফকিরহাট (বাগেরহাট) ও ফরিদ খান মিন্টু, শরণখোলা
ভাঙছে উপকূলের ঢাল সুন্দরবন
সমুদ্র উপকূলবর্তী মেহের আলী চরের সাইক্লোন শেল্টার কাম ফরেস্ট অফিস তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ে সমুদ্রে বিলীন হওয়ার পথে। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন নিজেই ভয়াবহ ভাঙনের মুখে। বঙ্গোপসাগর ও নদীর অব্যাহত ভাঙনে পূর্ব সুন্দরবনের অন্তত ১২টি এলাকা দ্রুত বিলীন হলেও গত সাত দশকে কত বনভূমি হারিয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব বা সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্য শূন্যতা কার্যকর পরিকল্পনার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এতে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে উপকূলীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বর্ম।

সাত দশক ধরে ভাঙছে

অবসরপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা ও শরণখোলার প্রবীণ বাসিন্দা আবুল বসার বলেন, ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে তাফালবাড়ী, গাবতলী ও বগী এলাকায় বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে ভাঙন শুরু হয়। তাঁর দাবি, গত সাত দশকে ওই এলাকায় আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে বর্তমান বগী ফরেস্ট অফিসের অবস্থানও আগের অবস্থান থেকে কয়েক কিলোমিটার সরে এসেছে।

আবুল বসার বলেন, ‘শুধু বগী নয়, সুপতি, মেহের আলী চর, কটকাসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চলছে। কিন্তু কত বনভূমি নদী ও সাগরে বিলীন হয়েছে, কত নতুন চর জেগেছে বা কত ভূমি আবার বনাঞ্চলে যুক্ত হয়েছে—এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান বা গবেষণা আমার জানা মতে বন বিভাগ, ভূমি বিভাগ কিংবা কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করেনি।’

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নদী ও সাগরে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে কটকা ও কচিখালী, সুপতি ফরেস্ট স্টেশন, তেরাবেকা ফরেস্ট অফিস, মেহের আলীর চরের সাইক্লোন শেল্টার কাম ফরেস্ট অফিস এবং বগী ফরেস্ট স্টেশন। পাশাপাশি জোংড়া, করমজল, দুবলা, কোকিলমনি, শাপলা, চরখালী, ডুমরিয়া, ঢাংমারি ও চান্দেশ্বর পয়েন্টেও ভাঙনের চাপ বাড়ছে। তবে এসব এলাকায় কত বনভূমি বিলীন হয়েছে বা নতুন ভূমি বনাঞ্চলে যুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সমন্বিত সরকারি তথ্যভান্ডার নেই।

পরিবেশবিদদের মতে, নির্ভরযোগ্য তথ্যের এই ঘাটতি ভাঙনের প্রকৃত মাত্রা নিরূপণ এবং কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা।

রেমালের পর তীব্র হয়েছে ভাঙন

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় রেমালের পর নদীভাঙনের গতি দ্বিগুণ হয়েছে। কিছু এলাকায় চর জাগছে, কিন্তু তা বনভূমিতে রূপ নিতে দীর্ঘ সময় লাগে।’

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত মধ্য জুন থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে নদী ও সাগরের ভাঙন সবচেয়ে তীব্র হয়। এ সময় উজানের ঢল, জোয়ার-ভাটা, উত্তাল সাগর এবং প্রবল স্রোতের কারণে বনভূমি ও নদীতীরের ক্ষয় দ্রুত বাড়ে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বলেশ্বর নদীর তীব্র স্রোতে বগী ফরেস্ট স্টেশনের দ্বিতল ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ভবনটি ইতিমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বন বিভাগের কর্মীরা অন্যত্র সরে গেছেন। এতে টহল ও বন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অন্য দিকে সমুদ্র উপকূলবর্তী মেহের আলী চরের সাইক্লোন শেল্টার কাম ফরেস্ট অফিস তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ে ক্ষয়ে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।

ফরেস্ট রেঞ্জার খলিলুর রহমান বলেন, ‘দুবলা জেলেপল্লি এলাকাসহ প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ে।’

সাড়ে ৩ কিলোমিটার এলাকা বিলীন

স্থানীয়দের ভাষ্য, সাত দশক ধরে চলা ভাঙন গত তিন দশকে আরও তীব্র হয়েছে। বগী গ্রামের প্রবীণ নাসির পঞ্চায়েত বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় যেখানে বগী অফিস দেখতাম, এখন সেটি সাড়ে তিন কিলোমিটার নদীর ভেতরে। এই ২৫-৩০ বছরে এতটা ভেঙে গেছে।’

ছগির মোল্লা নামে আরেকজন বলেন, ‘সাউথখালী ও বগী ইউনিয়নের অন্তত সাড়ে চার কিলোমিটার এলাকা গত কয়েক দশকে নদীতে চলে গেছে।’

হারাচ্ছে বন ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র

কটকা অভয়ারণ্যের সাবেক স্টেশন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, কটকার পুরোনো রেস্ট হাউস ইতিমধ্যে সাগরে বিলীন হয়েছে। মেহের আলী চরের সাইক্লোন শেল্টার, পানির পুকুর, জেটি এবং দুবলাপাড়ার ফরেস্ট অবকাঠামোও একই পরিণতির পথে।

খলিলুর বলেন, ‘একসময় যে বনবেষ্টিত পরিবেশ ছিল, তা এখন অনেক জায়গায় আর নেই।’

প্রকল্প নিয়ে বন বিভাগ-পাউবোর ভিন্ন তথ্য

ভাঙন রোধে বন বিভাগ পাউবোকে একাধিকবার সহযোগিতা চেয়েছে। বন বিভাগের দাবি, ২০২৭ সালে বিশ্বব্যাংক ও পাউবোর যৌথ প্রকল্প শুরু হবে। তবে পাউবোর বাগেরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল বলেন, ‘গত বছর সীমিত পরিসরে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। বন বিভাগে শুরু হবে এমন বড় কোনো প্রকল্প বা বাজেট সম্পর্কে আমার জানা নেই।’ এই ভিন্ন তথ্য সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন আরও জোরালো করছে।

সুন্দরবন দুর্বল হলে ঝুঁকিতে উপকূল

পরিবেশবাদী সংগঠন প্রদীপনের নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌস-উর-রহমান বলেন, ‘সুন্দরবনের আয়তন কমে গেলে উপকূলীয় নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এটি শুধু বন নয়, একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।’

স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন বয়াতী বলেন, ‘সিডর, আইলা ও রেমালে সুন্দরবনের গাছ ভেঙেছে, বন্য প্রাণী মরেছে ঠিকই কিন্তু বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা ঠেকিয়ে দিয়ে আমাদের উপকূলীয় বাসিন্দাদের রক্ষা করেছে। কিন্তু বন কমতে থাকলে ভবিষ্যতে সেই সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে।’

বন বিভাগের বক্তব্য

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘কটকা এলাকায় সমুদ্র ভাঙনের কারণে বন ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে সরে যাচ্ছে। ১২টি স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে এটি মোকাবিলার চেষ্টা করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত