Ajker Patrika

সুন্দরবনে উদ্ধার সেই বাঘিনী এখন সুস্থ, অবমুক্ত করা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভেদ

খুলনা প্রতিনিধি
সুন্দরবনে উদ্ধার সেই বাঘিনী এখন সুস্থ, অবমুক্ত করা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভেদ
খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসার পর বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে উঠেছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

সুন্দরবনে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে আহত হওয়া বাঘিনীটি পাঁচ মাসের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে। তবে বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ থাকায় অবমুক্ত প্রক্রিয়ায় গতি কমেছে। বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট কলার বা মাইক্রো চিপ ব্যবহারের পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। এদিকে প্রাণীটির খাদ্য ও চিকিৎসায় মাসে ২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে।

খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে বাঘিনীটি চিকিৎসাধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মত, বাঘিনীটি বয়সে প্রবীণ হওয়ায় বনে ছাড়ার পর তার গতিবিধি নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। সে কারণে স্যাটেলাইট কলার কিংবা মাইক্রো চিপের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছে।

খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, বাঘিনীটিকে প্রতিদিন ৪-৫ কেজি ফ্রেশ মাংস খেতে দিতে হচ্ছে। নিয়মিত ওষুধ সেবনে সামনের বাঁ পায়ের ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে গেছে। ক্ষতস্থানে নতুন চামড়া উঠেছে এবং বাঘিনীটি এখন ক্ষিপ্র গতিতে হাঁটতে পারছে। তাঁর ভাষ্য, প্রাণীটি বনে ছেড়ে দেওয়ার উপযোগী হয়েছে। চলতি মাসে আরও একটি সভা রয়েছে, সেখানে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নির্মল কুমার পাল আরও বলেন, স্যাটেলাইট কলার প্রযুক্তি আমেরিকা থেকে আনতে হলে আরও দুই থেকে তিন মাস লাগতে পারে। প্রযুক্তিটি ব্যয়বহুল এবং এ মুহূর্তে বন বিভাগের কাছে এ বাজেট নেই। তিনি জানান, যদি বাঘিনীর শরীরে ওই প্রযুক্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত না হয়, তাহলে চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বাঘিনীটিকে বনে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

গত ২১ মে বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জুম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপ-প্রধান বন সংরক্ষক (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) মোঃ জাহিদুল কবিরের সভাপতিত্বে সভায় খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আজিজ ও অধ্যাপক মনিরুল হুদা খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোঃ আনোয়র ইসলাম, সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এবং বাঘ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। তবে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভাটি শেষ হয়।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবনের শরকির খাল এলাকায় শিকারিদের পাতা ফাঁদে বাঘিনীটি আটকা পড়ে। খবর পেয়ে বন বিভাগের একটি বিশেষায়িত দল পরদিন ৪ জানুয়ারি প্রাণীটিকে উদ্ধার করে। পরে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে হস্তান্তর করা হয় এবং পাঁচ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা শুরু করা হয়।

বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত জুলকারনাইন বলেন, উদ্ধারকালে বাঘিনীটি ছিল নিস্তেজ, দুর্বল ও ক্ষীণকায়। তাঁর ভাষ্য, সামনের বাঁ পায়ে প্রায় ৩ ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে টানাটানির কারণে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল। অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ের ফলে মার্চ মাসের দিকে ঘা শুকিয়ে আসে। বর্তমানে ক্ষতস্থান ভরাট হয়ে সেখানে লোমও গজিয়েছে।

বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, বাঘের জীবনকাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই বাঘিনীর বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে এর ওজন প্রায় ৮০ কেজি।

ছানাউল্যা পাটওয়ারী আরও বলেন, সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়ার পরও কীভাবে বাঘিনীটির ওপর নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ রাখা যায়, তা নিয়ে বন কর্মকর্তারা ভাবছেন। আহত হওয়ার পর দীর্ঘদিন শিকার না ধরায় এর শিকারের সক্ষমতা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বাঘিনীটির জীবনকাল শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্য পরিবেশে অন্যান্য পশুর সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। এ পরিস্থিতিতে সুস্থ হওয়ার পর প্রাণীটিকে বনে ছাড়ার বদলে কোনো সাফারি পার্কে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজ বলেন, বাঘিনীটি যদি মুক্ত অবস্থায় একদিনও বাঁচতে পারে, সেটাই বড় পাওয়া। তাঁর ভাষ্য, বাঘিনীটির নিজের আবাসস্থলে বাঁচার ও মৃত্যুর অধিকার আছে। সাফারি পার্কে বন্দী রাখলে প্রাণীটি প্রাকৃতিক মৃত্যুর অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

এম এ আজিজ স্যাটেলাইট কলার লাগিয়ে প্রাণীটিকে পর্যবেক্ষণে রাখার পক্ষেও মত দেন। তিনি জানান, ভারতের সুন্দরবন অংশে এমন ছয়টি বাঘকে স্যাটেলাইট কলার দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এ বাঘিনীটিকেও প্রযুক্তির আওতায় আনা যেতে পারে।

বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমদ বলেন, ২০২৪ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিনবার শনাক্ত করা হয়েছিল। সে হিসাবে লোকালয় থেকে সবচেয়ে দূরের জায়গায় এটিকে অবমুক্ত করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

ইমরান আহমদ বলেন, বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত ওঠায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে। তবে চলতি জুনের মধ্যে প্রাণীটিকে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত