Ajker Patrika

মাগুরার মাটিতে ৬৮ প্রত্নস্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ চারটি

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
মাগুরার মাটিতে ৬৮ প্রত্নস্থান
সংরক্ষণের উদ্যোগ চারটি
রাজা সীতারাম রায়ের তোশাখানা। এটি পুরাকীর্তি ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

মাগুরার মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর উপজেলায় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়ে ৬৮টি প্রত্নস্থানের সন্ধান পেয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এসব স্থানের মধ্যে ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড, রাজা সীতারাম রায়ের তোশাখানা, গঙ্গারামপুরের আটচালা শিবমন্দির এবং শ্রীপুর জমিদারবাড়ির তোরণকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে জেলায় একটি জরিপ করা হয়। ওই জরিপে এসব প্রত্নস্থানের তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের রিপোর্ট প্রকাশের প্রস্তুতিও চলছে। এর মধ্যে গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড, গঙ্গারামপুরের শিবমন্দির, জমিদার সীতারাম রায়ের তোশাখানা এবং শ্রীপুর জমিদারবাড়ির তোরণকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৬৮টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামে (প্রাচীন নাম ভূষনা বা সতাই) রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী এবং শ্রীপুর উপজেলায় মুজদিয়া গ্রামে ‘ওস্তাদের কদর’ কবিতার জন্য বিখ্যাত কবি কাদের নেওয়াজের বাড়ি আগে থেকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কবি কাদের নেওয়াজ এলাকাবাসীর কাছে যতটা পরিচিত, রাজা সীতারাম রায় ততটা নন। নবাব শায়েস্তা খান তাঁকে সেখানে জমিদারি দান করেন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের শেষ সময়ে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে গোলযোগ চলাকালে তিনি নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মহম্মদপুর থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন এলাকার ওপর তাঁর কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। ১৭১৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

এদিকে সম্রাট শের শাহ লাহোর থেকে দিল্লি ও কলকাতা হয়ে সোনারগাঁ পর্যন্ত গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড (জি টি রোড) নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক এই সড়ক যশোরের বেনাপোল দিয়ে ঢুকে বর্তমান মাগুরা জেলা হয়ে ফরিদপুরে প্রবেশ করে। এই সড়কের মহম্মদপুর ও শালিখা উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রাম থেকে নহাটা, গঙ্গারামপুর, বুনাগাতী হয়ে সরুয়েনা গ্রাম পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার অংশ জরিপে শনাক্ত হয়েছে। রোডের পুরোটাই এখন পাকা। শিগগির এই রাস্তা সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হবে বলে আশা করছে খুলনা বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, জরিপে চিহ্নিত মোগল আমলে নির্মিত গঙ্গারামপুরের আটচালা শিবমন্দির, রাজা সীতারামের বাড়ির সাতটি স্থাপনার মধ্যে তোশাখানা এবং শ্রীপুরের জমিদারবাড়ির তোরণ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে গঙ্গারামপুরের আটচালা শিবমন্দির স্থাপনাটি ভগ্নপ্রায় অবস্থায় এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।

শ্রীপুরের জমিদারবাড়ির তোরণ। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা
শ্রীপুরের জমিদারবাড়ির তোরণ। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

জরিপে শালিখা উপজেলার গোপালগ্রামে বায়তুন নূর বা শাহি মসজিদ হিসেবে পরিচিত একটি মসজিদ শনাক্ত হয়েছে। সেটি মোগল আমলে নির্মিত বলে অনুমিত হয়। শনাক্ত হয়েছে একই সময়ে নির্মিত মহম্মদপুরের রাঢ়িখালী গ্রামে জমিদার উদয় নারায়ণ চৌধুরীর বাড়ি, শালিখার বামনখালি গ্রামে নীলকুঠির কুঠিয়ালের বাসভবন এবং শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে কবি ফররুখ আহমদের বাড়ি। বাড়িটির ওপর দিয়ে রেললাইন স্থাপনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার সেটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল। তা আপাতত স্থগিত রয়েছে।

যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা বিখ্যাত সেই ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ—/ মা গো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?’ কাজলা দিদি নামে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা কবিতা স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পড়ে কৈশোরে সবাই আলোড়িত হয়েছেন। এই কবির পৈতৃক নিবাস ছিল শ্রীপুর উপজেলার সেনগাতী-সরই নগর গ্রামে। তাঁরা পশ্চিম বাংলায় চলে যাওয়ার সময় একটি মুসলমান পরিবারকে সব সম্পত্তি দিয়ে যান। তাঁরা সেখানে বাস করছেন। তবে পুকুর, পরিবারের মন্দির, পানির কূপ ইত্যাদি এখনো রয়েছে।

প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবিদের একজন বড়ু চণ্ডীদাস। উচ্চবর্ণের চণ্ডীদাস নিচু বর্ণের রজকিনীর প্রেমে মজেছিলেন। তাঁদের প্রেমকাহিনি হিন্দু সমাজে চর্চিত হয়। সেই স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রয়েছে শালিখা উপজেলার ধোপাখোলা গ্রামে চিত্রা, ফটকি ও বেগবতী নদীর সংগমস্থলে চণ্ডীদাস-রজকিনীর ঘাট। নদীগুলো অবশ্য সরে গিয়ে সেখানে একটা বাঁওড় আছে। কিছু দূরে আছে রজকিনীর বাড়ির ধ্বংসস্তূপ।

এসব স্থাপনা জরিপ রিপোর্টে স্থান পেলেও প্রয়োজনীয় প্রত্নবস্তু বা বয়স বিবেচনায় পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের উপযুক্ত হয়নি বলে জানা গেছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জানুয়ারি-এপ্রিলে মাগুরার মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর উপজেলায় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালাই। জরিপে ৬৮টি প্রত্নস্থানের তথ্য সংগ্রহ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে জি টি রোড বা শেরশাহ সুরি সড়ককে পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষিত বলে দ্রুত ঘোষণা করা হবে।’ এ ছাড়া আরও তিনটি স্থানকে সংরক্ষিত ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত