Ajker Patrika

সোনামসজিদ স্থলবন্দর: এক বছরে ২৮২ কোটি টাকা রাজস্ব কমেছে

  • আগে বিভিন্ন ধরনের ফল, প্লাস্টিকশিল্পের কাঁচামালসহ নানা পণ্য আমদানি হতো
  • অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক সংকটকে দুষছেন আমদানিকারকেরা
  • পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস অফিস না থাকায় প্রশাসনিক কাজের জন্য যেতে হয় রাজশাহীতে
  • ব্যবসায়ীরা ঝুঁকছেন অন্য বন্দরের দিকে
আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
সোনামসজিদ স্থলবন্দর: এক বছরে ২৮২ কোটি 
টাকা রাজস্ব কমেছে
ফাইল ছবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ফল, পাথর, গার্মেন্টস কাঁচামাল, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হতো। কিন্তু উচ্চ আমদানি ব্যয়, পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস অফিস না থাকা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ীরা ঝুঁকছেন অন্য বন্দরের দিকে। ফলে আমদানি কমছে। আর এর প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়েও।

সোনামসজিদ স্থল কাস্টমস স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১০১ কোটি ৮৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে ৮১৯ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৮ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৮২ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ কম। অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৯০৯ কোটি ৪৬ লাখ ১ হাজার ১২৬ টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব কমেছে ৮৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি।

কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফল আমদানি বন্ধ থাকা, যানজট, উচ্চ আমদানি ব্যয়, পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস অফিস না থাকা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় এই বন্দর দিয়ে আমদানি কমছে। ফলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দরটি।

মাসভিত্তিক রাজস্ব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রায় প্রতিটি মাসেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় কমেছে ২৩ শতাংশ, আগস্টে ২৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, অক্টোবরে ২১ দশমিক ২ শতাংশ, নভেম্বরে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৩১ দশমিক ১ শতাংশ, জানুয়ারিতে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে মার্চ ও মে মাসে। মার্চে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কমে প্রায় ৪৫ শতাংশ। মে মাসে তা পৌঁছে যায় প্রায় ৫৯ শতাংশে। কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সময় আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় রাজস্বেও বড় পতন ঘটে।

পানামা পোর্টের ব্যবস্থাপক মাইনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই পাথর। আগে বিভিন্ন ধরনের ফল, প্লাস্টিকশিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য এলেও এখন সেগুলোর বেশির ভাগ বন্ধ। একটি বন্দরের আমদানি যদি এক বা দুটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হলে রাজস্বও অস্থির হয়ে পড়ে। পণ্যের বৈচিত্র্য না থাকাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা।’

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির ব্যয় এখন দেশের অন্য স্থলবন্দরের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।

সোনামসজিদ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোবিনুর রহমান মিঞা বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস অফিস না থাকায় এখনো অনেক প্রশাসনিক কাজের জন্য রাজশাহীতে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ—দুটোই বাড়ে। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যবসায়ীরা দ্রুত সেবা চান। যেখানে সময় কম লাগবে, স্বাভাবিকভাবে তাঁরা সেই বন্দরই বেছে নেবেন।’

মোবিনুর আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক সহযোগিতাও আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আমদানি কমে গেছে।

আমদানিকারক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘পানামা পোর্টের ইয়ার্ডে জায়গার সংকট রয়েছে। ভারতীয় খালি ট্রাক দ্রুত ফিরে যেতে না পারায় দীর্ঘ যানজট হচ্ছে। জিরো পয়েন্ট থেকে বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত প্রায়ই ট্রাকের সারি থাকে। এতে ব্যবসায়ীরা বিকল্প বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক আমদানিকারক বলেন, ‘অনেক সময় কাস্টমের বিভিন্ন অজুহাতে পণ্য খালাসে দেরি হয়। দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা গেলে আমদানিকারকদের আগ্রহ বাড়ত। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির কারণে অনেকে অন্য বন্দর ব্যবহার করছেন।’

একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বন্দরে পর্যাপ্ত গুদাম নেই, পণ্য রাখার জায়গার সংকট রয়েছে। ভালো মানের আবাসিক হোটেলেরও অভাব। পাশাপাশি মাদকসেবী ও অসাধু চক্রের তৎপরতায় ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। তাঁদের মতে, দেশের অন্য স্থলবন্দরে তুলনামূলক ভালো সুবিধা থাকায় অনেক আমদানিকারক সোনামসজিদ বন্দর ছেড়ে যাচ্ছেন।

সোনামসজিদ স্থল কাস্টমস স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. রাজু মিয়া বলেন, ‘ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ফল আমদানি বন্ধ থাকা, যানজট, কিছু সময় পাথর আমদানি বন্ধ থাকা এবং গার্মেন্টস ও প্লাস্টিকজাতীয় পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে রাজস্ব ঘাটতি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত